“চতুষ্কোণ”-এর ব্যাপারস্যাপার

মুম্বইতে বসে বাংলা ছবি দেখা খুব চাপের ব্যাপার, নিয়মিত ‘বুকমাইশো’ (অশ্লীল ভাববেন না, ওটা bookmyshow.com) –তে চোখ রাখতে হয়। রিলিজ হয় মাত্র তিনদিনের জন্য, আর মনে হয় পয়সা বাঁচানোর জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়না। তবে তাই বলে “জানালা দিয়ে বউ পালালো”-টাইপের ছবি আসেনা এখানে, মোটামুটি বড় ব্যানারওয়ালা ছবিই মুক্তি পেয়ে থাকে। দেড় বছর পুণে-মুম্বইতে বাস করে একটা আইডিয়া হয়ে গেছে যে কোন ছবিটা এখানে রিলিজ করতে পারে। তাই “চতুষ্কোণ” বেরোনোর পরে আশা ছিল সিনেমাটা এখানেও আসবে। তার ওপর পুজোর সময় গান গাইতে এসে অনুপম রায় নিজেও সেই খবর দিয়েছিল।

কিন্তু কোথায় কি? এক একটা উইক-এন্ড চলে যায়, কিন্তু “চতুষ্কোণ” আর আসেনা, আমি মনের দুঃখে ঘরের কোণায় গুম হয়ে বসে থাকি, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি, “এবারেও এলনা”!

অবশেষে কয়েকদিন আগে কলকাতা-নিবাসী এক বন্ধু জানালো ছবিটা এই সপ্তাহান্তে মুম্বইতে বেরোতে চলেছে। সোমবার থেকেই ‘বুকমাইশো’-তে চোখ রাখতে শুরু করলাম, যদিও জানি নতুন ছবির খবর বুধবারের আগে ওখানে দেয়না। কিন্তু বুধবার এল, চলেও গেল, তবুও তার দেখা নেই।

বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম কলকাতার বন্ধুকে গুছিয়ে কিছু গালাগালি দেব, কিন্তু বাড়ি ঢুকতেই বউ একগাল হাসি নিয়ে বলল, “এসেছে! সে এসেছে!”

যাক্‌ বাবা, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম!

শনিবারের বারবেলায় চলে গেলাম সিনেমাটা দেখতে, সেই মালাড-এ। কাঞ্জুর থেকে মালাড বেশ দূর, কিন্তু দূরত্ব দিয়ে আমাদের দাবায়ে রাখা যায়নি।

c1

সৃজিতের সিনেমা ভাল লাগার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে তিনি খুব ভাল গল্প বলতে পারেন। তাঁর প্রথম সিনেমা থেকেই আমি তাঁর ভক্ত, মাঝে “মিশর রহস্য” আর “হেমলক সোসাইটি” দেখে একটু দমে গিয়েছিলাম, কিন্তু “জাতিস্মর” সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া ইন্টারনেট-এ “চতুষ্কোণ”-এর ট্রেলার দেখে খুব ভাল লেগেছিল, তাই সিনেমাটা দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলাম।

ছয় সপ্তাহ আগের সিনেমা, তাছাড়া কাগজে একে নিয়ে চর্চা কিছু কম হয়নি। তাই গল্পটা মোটামুটি সবারই জানা। একজন প্রযোজক চারটে ছোট ছোট গল্প নিয়ে একটা সিনেমা বানাতে চান। শর্ত দুটোঃ এক, চারটে গল্প পরিচালনা করবেন তাঁর পছন্দের চারজন পরিচালক, আর দুই, চারটে গল্পের একটা কমন থিম থাকবে – মৃত্যু! সেইমতো প্রযোজককে গল্প শোনাতে বকখালির কাছে হেন্‌রীজ আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন সেই চারজন – দীপ্ত, শাক্য, তৃণা এবং জয়ব্রত ওরফে জয়। যাত্রাপথে প্রত্যেকেই নিজেদের গল্পগুলো শোনাতে থাকেন, এবং বাকিদের মতামত শুনতে থাকেন। তার মধ্যে দীপ্ত আর তৃণার মধ্যে পুরনো সম্পর্কের চোরাস্রোত, দীপ্ত-শাক্যের উপভোগ্য কথোপকথন, বয়েসে কনিষ্ঠতম জয়ের প্রতি বাকি তিনজনের স্নেহমিশ্রিত প্রশ্রয় – এইসবও আছে, আর পরিচালক সেগুলো খুব মুন্সিয়ানার সঙ্গে বুনেছেন।

অতএব বোঝাই যাচ্ছে, এই ছবিতে কেবল একটা গল্প নেই, আছে চার-চারটে ছোটগল্প আর গোটাটা মিলিয়ে একটা, অর্থাৎ সবমিলিয়ে পাঁচটা। কিন্তু গল্পের এই আধিক্য দর্শককে ক্লান্ত তো করেইনা, বরং উপস্থাপনার গুণে দর্শকের কাছে গোটা ব্যাপারটা খুব উপভোগ্য হয়ে ওঠে। চারটে গল্পই খুব ভাল, তবে ব্যক্তিগতভাবে এদের মধ্যে তৃণার গল্পটা আমার বেস্ট লেগেছে।

এতগুলো গল্প বলতে হয়েছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই সিনেমাটা একটু লম্বা হয়েছে। কিন্তু প্রায় আড়াইঘন্টার এই সময়সীমার মধ্যে কখনই মনে হয়নি ‘বোর’ হচ্ছি, বরং সবসময়েই পরের মুহুর্তটার জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম।

এই সিনেমায় অনেকে আছেন, ছোট-ছোট ভূমিকায় তাঁরা বেশ মানিয়েও গেছেন। তার মধ্যে আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে নীল মুখোপাধ্যায়কে। একটামাত্র দৃশ্যেই তিনি নিজেকে চিনিয়ে দিয়েছেন। বরুণ চন্দকেও বেশ ভাল লাগে, আর তাঁর কন্ঠে ‘ওথেলো’ শোনাটা বোনাস।

সৃজিতের সিনেমায় গানের একটা আলাদা মাহাত্ম্য থাকে সবসময়, এই ছবিও তার ব্যতিক্রম নয়। ‘বসন্ত এসে গেছে’ গানটা ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে হিট করেছে, এছাড়া অনুপমের কন্ঠে ‘বোবা টানেল’ গানটাও খুব ভাল।

এবারে মুখ্য ভূমিকায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কথায় আসি।

c2

অপর্ণা সেন যথারীতি ভাল অভিনয় করেছেন। বয়েস বাড়ার সাথে সাথে তাঁর গ্ল্যামারটাও বেশ আলাদারকমের ভাল লাগে। অন্যদিকে পরিচালক গৌতম ঘোষকে অতটা পছন্দ না করলেও, অভিনেতা গৌতম ঘোষের প্রতি আমার ভাললাগাটা দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে। অদ্ভুতরকমের ন্যাচারাল অভিনয় করেন ভদ্রলোক, আর তাঁর এই অভিনয়ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর জন্য সৃজিতকে বাহবা দিতেই হয়।

তবে এই ছবির তুরুপের তাস তিনজন। প্রথমজন, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। সিনেমাটা দেখার সময় ভাবছিলাম, লোকটাকে কতটা বাজেভাবে ব্যবহার করেছে টালিগঞ্জ! দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন চিরঞ্জিত। বেদের মেয়ে জোস্‌না-টাইপের আজেবাজে সিনেমার প্রতীক ছিলেন তিনি এতদিন, এবারে সৃজিতের কল্যাণে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেড়িয়েছে। এতদিনকার অতি-নাটকীয় সমস্ত ম্যানারিজম্‌ ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছেন তিনি। আশা করা যায় এই সিনেমার পরে ভদ্রলোকের প্রতিভার ঠিকঠাক ব্যবহার হবে।

দ্বিতীয়জন, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।

c3

এই ছবির পরম প্রাপ্তি তিনিই। সোজা কথায়, ফাটিয়ে দিয়েছেন, কোনো কথা হবেনা। তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয় বললেও অত্যুক্তি হবেনা।

তৃতীয়জন কৌশিক গাঙ্গুলী। মিনিটদুয়েকের একটা রোলে ছিলেন, কিন্তু সেই দুই মিনিটে অনেকটা ক্ষীর খেয়ে নিয়েছেন ভদ্রলোক। পুরো হাঁ হয়ে গিয়েছি তাঁকে দেখে!

ছবির শেষদিকে একটা মোচড় আছে, যেটা দেখে সৃজিতের ওপর আমার ভক্তিটা দুই ডিগ্রী বেড়ে গেছে। বলতে ইচ্ছে করছে – আপনি থাকছেন স্যার।

সবমিলিয়ে সিনেমাটাকে পাঁচে পৌনে পাঁচ দিতে হল। নিজে কোনোদিন কোনো বিষয়ে ফুলমার্কস পাইনি, তাই আক্রোশবশত সোয়া নম্বর কেটে নিলাম।

তবে আমার কাছে এটাই এখনও পর্যন্ত সৃজিতের বেস্ট সিনেমা।

হ্যাঁ, “বাইশে শ্রাবণ”-এর থেকেও!

(ছবি উৎসঃ গুগ্‌ল্‌)