ইন্টার-অ্যাক্টিভ সেশন

অফিসে তুমুল চাপরাশি চলছে, চোখেমুখে অন্ধকার দেখছি পুরো। সকালবেলা কাগজ অবধি পড়ার সময়টুকু পাচ্ছি না। অফিসে গিয়ে ইন্টারনেটে কাগজটা খুলছি বটে, কিন্তু ওই খোলাই সার – খবরগুলো পড়া আর হচ্ছে না। রাজ্যে, দেশে, বিদেশে কত নিত্যনতুন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, আর আমি সেসবের খোঁজ না রেখে কিউবিক্ল-এর ব্যাং হয়ে মনিটরে মাথা ঠুকছি। বিদ্রোহ করার ক্যাপা নেই, তাই শোষণযন্ত্রের হ্যাপা সামলাচ্ছি।

দিনকয়েক আগে আর এক হ্যাঙ্গাম! মেলবক্স খুলে দেখি কর্তৃপক্ষ মেল করে সমস্ত কর্মীকে জানিয়েছেন যে শুধু অফিসের কাজ করলেই চলবে না, সমাজে গঠনমূলক অবদানও রাখতে হবে। কি কি ভাবে সেই অবদান রাখা যাবে, তার একটা লিস্টও দেওয়া আছে, তার মধ্যে থেকে যেকোনো একটা ‘টাস্ক’ পারফর্ম করতে পারলেই কেল্লাফতে – সামাজিক জীব হিসেবে নিজের স্ট্যাটাসটাকে দুই পোঁচ বাড়িয়ে নেওয়া যাবে। একে কাজের চাপে জীবন ওষ্ঠাগত, তার ওপর এইসব অকাজের বোঝা চাপাবার কোনো মানে হয়?

হোক্স মেল হতে পারে ভেবে ম্যানেজারের কাছে গেলাম। লোকটা যথারীতি স্লাইড বানাচ্ছিল, আমার কথা শুনে হাঁহাঁ করে হাত-পা ছুঁড়ে বলল, “কি বলছ! আমাদের মহান কোম্পানীতে এসব হয়না। মেলটা খাঁটি, আর কাজটাও জেনুইন, এবং তার একটা ডেডলাইন-ও আছে”।

মাইরি! শালা আজকাল সমাজে অবদান রাখতে গেলেও ডেডলাইন মেন্‌টেইন করতে হবে? সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। ম্যানেজার, তথা ড্যামেজারকে শুধোলাম, “কবে সেই শুভদিন?”

“ফ্রাইডে নেক্সট উইক, আর কোন টাস্কটা করলে, তার একটা ‘থরো’ রিপোর্ট পাঠিয়ে দিও, বাই ফ্রাইডে ই.ও.ডি.”, বলে ব্যাটা আবার পাওয়ারপয়েন্টে চোখ রাখলো।

হয়ে গেল! মনের মধ্যে “কি করি আমি, কি করি আমি – বল্‌রে সুবল” গানটা বেজে উঠলো। জায়গায় ফিরে এসে লিস্টে চোখ বোলাতে আরম্ভ করলাম। কত রকমের কাজ – রাস্তায় ঝাড়ু দেওয়া থেকে নাস্তায় (স্বপাক) নাড়ু নেওয়া, সবই আছে। কিন্তু বেশিরভাগই আমার সাধ্যের বাইরে। বার খেয়ে লাভ নেই, যা অপোগন্ড সমাজ, আমি কেস খেলে কেউ সাহায্য তো করবেই না, উল্টে ঠেস দিয়ে শেষ করে দেবে। তাই একটা সোজা ‘টাস্ক’ পেলেই সুবিধে।

অবশেষে নীচের দিকে একটা টাস্ক চোখে পড়ল – আমার প্রোফেসনের সঙ্গে যুক্ত নয়, এমন একজনের সঙ্গে একটা ‘ইন্টার-অ্যাক্টিভ সেশন’ চালাতে হবে, অবশ্য সেশনটা কি নিয়ে হবে সেটা বলা নেই। দেখেশুনে মনে হল এই একটাই মাত্র টাস্ক, যেটা আমার দ্বারা হওয়া সম্ভব। কিন্তু সেশনটা চালাবো কার সঙ্গে? অনেক ভেবেও কোনো কূলকিনারা পেলাম না।

পরদিন ছিল শনিবার, ছুটির দিন। বেশ আয়েস করে চা-টা খেয়ে আড়মোড়া ভাঙছি, এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। দরজা খুলে দিতেই “কি গুরু, কি খবর? একদম ডুমুরের ফুল হয়ে গেলে দেখছি!” বলতে বলতে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লো পাঁচু মস্তান।

নানাবিধ কারণে অনেকদিন পাঁচুর সঙ্গে দেখাসাক্ষাত হয়নি, তাই এতদিন বাদে ওকে দেখে বেশ খুশী হয়ে উঠলাম।

সোফার ওপর জমিয়ে বসে, সামনে রাখা জলের বোতল থেকে জল খেয়ে, পাঁচু বলল, “কি ব্যাপার বল তো গুরু, দেখা নেই কেন? তুমি তো দেখছি ভোটের পরে নেতাদের মতন হয়ে গেছ।”

আমি হেসে বললাম, “আর বোলো না, অফিসে কাজের চাপে খুব খারাপ অবস্থা চলছে”।

পাঁচু মাথা নাড়ে, বলে, “যা বলেছো গুরু, চাপ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সব ওই ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতিওয়ালা বুড়োটার জন্য। শালা বলে কিনা, নিজেও ঘুমোবে না, কাউকে ঘুমোতেও দেবে না! কিন্তু নেতারা তো ফিতে কাটতেই ব্যস্ত, মাঝখান থেকে হুড়কো খাই আমরা”।

এইসব কথা একমাত্র পাঁচুর পক্ষেই বলা সম্ভব! হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার কি খবর? এর মধ্যে তুমিও তো একবারও বাড়িতে পা রাখোনি”।

আমার কথায় পাঁচু একটু উদাস হয়ে যায়, তারপর বলে, “আর বোলো না মাইরি, আমিও হেব্বি চাপে আছি। ক্যালানে লোকজনে ভরে গেছে দেসটা”।

“কেন? কি হল আবার?”

“কি আবার হবে? কাল মিছিলে গিয়েছিলাম। সিরিয়াল-সিনেমার সব ঝিঙ্কু মামণিরা আর দাঁত-বার-করা হিরোগুলো এসেছিল। চ্যাপলিন, শীলদা, সুবোদ্দা এরাও সব ছিল”।

আমি বললাম, “ভালই তো। মিছিল তো তাহলে সাকসেসফুল, নাকি?”

পাঁচু একটু রেগে যায়, বলে, “জমায়েতটা হেব্বি ছিল গুরু, কিন্তু ওই ক্যালানেগুলোই মগে জল করে দিল। মিডিয়াও হারামি, বেছেবেছে কয়েকটা ন্যাকাবোকা মামণিকে মিছিলের কারণ জিজ্ঞেস করল। আরেবাবা, মিছিলের আবার কারণ হয় নাকি? দিদির ইচ্ছে হয়েছে, তাই মিছিল হবে, ব্যস, ফুরিয়ে গেল!”

সেটা ঠিক। রাজ্যে দিদির ইচ্ছেই সব। আমি বললাম, “কিন্তু মিডিয়াকে কি ওরকম করে বলা যায়?”

পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “কেন বলা যাবেনা? ভয়ের কি আছে? গব্বর বলেছে, ‘যো ডর গ্যায়া, উয়ো মর্‌ গ্যায়া’। সোজাসুজি বলে দিলে হারামিগুলো আর ঘাঁটাতে আসতো না। ‘কি জানি’, ‘ডেকেছে বলে এসেছি’ এইসব দরকচা-মার্কা বুলি ঝাড়লে সকুনগুলো তো ছিঁড়ে খাবেই। তাছাড়া- !”

পাঁচু দম নেওয়ার জন্য থামে, আমি বলি, “তাছাড়া কি?”

“তাছাড়া দিদির আমলে কত নতুন জিনিস হচ্ছে বলো তো? কালো জামা, কালো ছাতা নিয়ে মিছিল আগে কেউ দেখেছে? মাটির হাঁড়ির মিছিলটাও একঘর আইডিয়া। আমার বন্ধু বঙ্কু তো হাঁড়ি মাথায় করে ভাসানের নাচও নেচেছে, পাশের বাড়ির বৌদির সঙ্গে, টিভিতে দেখিয়েছে। এইসবের কদর না করে মিডিয়া খালি আঙ্গুল করে। সালারা বোঝে না, মিছিলে হাঁটলে কত্ত এক্সাসাইজ হয়, এম এল এ-দাও সেদিন বলছিল। দাদা তো সেইজন্য সব মিছিলে যায়”।

স্বনামধন্য এম এল এ-দাও হাঁড়ি মাথায় দিয়ে নেচেছিলেন কিনা, সেটা জিজ্ঞেস করব কিনা ভাবছি, এমন সময় পাঁচু আবার বলল, “আসলে কি বল তো, ভেজাল মাল খেয়েখেয়ে পাবলিক সব কিরকম ভীতুমার্কা হয়ে যাচ্ছে”।

আমি শুধোই, “সেটা কিরকম?”

“ভীতু নয়? যেই সুনলো সিবিআই পোস্‌নো করবে, ওমনি মন্ত্রীটা হস্‌পিটালে সেঁধিয়ে গেল। কয়েকদিন সেখানে মাছভাত খেয়ে আবার অন্য হস্‌পিটালে গেল, মাছের পিস ছোট বলে। এদিকে বলে কিনা বুকে ব্যথা! যত্ত ঢপ। আসোল কথা ধক্‌ নেই। এদিকে চুরি করার বেলায় একহাত লম্বা জিভ বার করে লক্‌লক্‌ করে”।

পাঁচুর কথা বলার ধরণে হেসে ফেলি, পাঁচু সেটা খেয়াল না করে বলে চলে, “আগে দ্যাখ সিবিআই কি বলে। তা না, আগেই চম্পট। এতে করে মিডিয়া তো পেছনে হুড়কো দেবেই। তাছাড়া পোস্‌নো হবে, তারপর মামলা হবে, তারপর তার ডিসিসান হবে…তদ্দিনে তো দস-বিস বছর পার হয়ে যাবে। মন্ত্রী হয়ে এরকম গবেট হলে কি করে চলবে? তাই না, বলো গুরু?”

কথাটা ঠিকই। আমি বলি, “সারদা কেলেঙ্কারিতে তো সবাই জড়িয়ে পড়ছে। তোমার এম এল এ-দা আবার এইসবে ফেঁসে যাবেন না তো?”

পাঁচু বলে, “কি যে বল গুরু! এম এল এ-দা টাকিলা শট খাওয়া ঘাঘু মাল। সপ্তায় দুটো শটের বেশি খায়না। এইসব হুব্বাগুলোর মতন গলা অবধি মাল খেয়ে বমি করে ভাসায় না। বুইলে তো, কি বলতে চাইছি?”

পাঁচুর কথা বুঝলাম না ঠিক, তাই এম এল এ-দার ওপর ভক্তিটা আরো খানিকটা বেড়ে গেল আমার। প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বললাম, “তবে যাই বলো, রাজ্যে কিন্তু খুব অরাজকতা চলছে। বর্ধমানে যেটা হল, সেটা কি ঠিক হল?”

পাঁচুর মুখটা কিরকম দুঃখী হয়ে যায়, বলে, “যা বলেছো গুরু। বললাম না ভেজালের যুগ? সালা বোমার মসলাতেও ভেজাল! তাই ফাটলো। দিদির কপালটাও খারাপ। কবে থেকেই তো ওখানে বোমপট্‌কা বানানো হয়, বেছে বেছে দিদির আমলেই ফাটতে হল? এ তো বোম ফাটা নয়, এ হল গিয়ে পেছন ফাটা! তবে একটা ব্যাপার ভাল হল।”

এর মধ্যে ভালটা কি, সেটা বুঝতে পারলাম না, তাই ওকেই জিজ্ঞেস করলাম, “কিরকম?”

“আগে বদ্ধমান বলতে লোকে সুধু সীতাভোগ-মিহিদানা জানতো, এখন চীনেপট্‌কাও জানবে, ভাল না?”

ব্যাপারটা এভাবে অবশ্য ভেবে দেখিনি আমি। সত্যিই, পাঁচুর ভাবনার ক্যাপাই আলাদা।

ওকে বললাম, “শুনছি সিবিআই নাকি দিদিকে ধরবে চুরির দায়ে, সত্যি নাকি?”

ভেবেছিলাম পাঁচু রেগে যাবে এই কথা শুনে, কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে পাঁচু হোহো করে হেসে উঠলো। খানিকক্ষণ বাদে হাসি থামিয়ে বলল, “তুমি না গুরু, একদম বাকোয়াস। আমাদের দিদি হাওয়ায় চপ্পল পড়ে, ব্যাগে চুয়াল্লিশ টাকা বারো আনা নিয়ে ঘোরে। ওটাই দিদির ইমেজ। চুরিফুরি দিদির ভাইদের জন্য, দিদি সাক্ষাৎ মা সারদা। অনেকটা বাবা রামদেবের মতন”।

যাব্বাবা, এর মধ্যে উনি আবার কোথা থেকে এলেন? পাঁচু মাথা নেড়ে বলল, “বুইলে না তো? রামদেবের তো নাকি বিদেসে কোথায় ফুডকোর্ট না কিসব আছে। কিন্তু সেসব কেউ মানে? রামদেব মানেই একপেট লাউ খেয়ে, পেট টেনে, নাকে হাত নিয়ে ফোঁসফোঁস করে নিস্‌সাস ফেলা! কিন্তু তুমিই বল গুরু, শুধু লাউ খেয়ে পেট টানলে ফুডকোর্ট বানানো যায়?”

পাঁচুর প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার কাছে ছিলনা, অবশ্য ওর বেশিরভাগ প্রশ্নের ক্ষেত্রেই থাকেনা। তাই আর কিছু বললাম না।

আরো খানিকক্ষণ গল্পগুজব করে পাঁচু চলে গেল। ও যাওয়ার পরে ভাবলাম, এটাকেই ইন্টার-অ্যাক্টিভ সেশন বানিয়ে দিলে কেমন হয়? ওর কল্যাণেই সমাজে কিছু অবদান রাখা যাক তাহলে।

সাধে কি আর পাঁচু মস্তানকে এত ভালবাসি আমি?

8 thoughts on “ইন্টার-অ্যাক্টিভ সেশন

  1. Meghpeon নভেম্বর 30, 2014 / 5:12 অপরাহ্ন

    অনেকদিন পর পাচু র সাথে সাক্ষাত হলো, ভালো লাগল। লেখাটাও বেশ। মিছিলেরই যুগ এখন…থুরি না জেনে মিছিলে যোগদানের যুগ এখন।

    • অরিজিত নভেম্বর 30, 2014 / 9:32 অপরাহ্ন

      লেখা ভাল লাগার জন্য অনেক ধন্যবাদ পৌষালী। 🙂
      তোমার শেষের কমেন্টের সঙ্গে একদম একমত। 😀

  2. Maniparna Sengupta Majumder ডিসেম্বর 1, 2014 / 2:42 পুর্বাহ্ন

    চ্যাপলিন, শীলদা, সুবোদ্দা 😀 😀

    দিদির ব্যাগে কত থাকে পাঁচু তাও জানে… 😛 যাচ্ছেতাই রকমের ভাল হয়েছে লেখাটা… 😀

    • অরিজিত ডিসেম্বর 1, 2014 / 10:36 অপরাহ্ন

      পাঁচু সব জানে 😀
      কমেন্ট পেয়ে আমারও খুব ভাল লাগলো, অনেক ধন্যবাদ। 🙂

  3. Sidhu Mukujjey ডিসেম্বর 14, 2014 / 1:41 অপরাহ্ন

    talented panchu ke bohudin por pelam 🙂
    sotti to ekhon “thog bachtey gnaa ujaar” hobar upokrom 🙂

    • অরিজিত ডিসেম্বর 14, 2014 / 6:00 অপরাহ্ন

      যা বলেছিস। 🙂 তবে যা অবস্থা, পাঁচুও ইদানিং মুখ দেখাতে লজ্জা পাচ্ছে। 😛

  4. Sujan মার্চ 2, 2015 / 2:57 অপরাহ্ন

    sottie osadhoron hoyeche lekha ta……

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s