বড়দের গোয়েন্দা

গোয়েন্দা গল্পের প্রতি আমার আকর্ষণটা সেই ছেলেবেলা থেকে। ইস্কুলে পড়াকালীন এক বন্ধুর কাছ থেকে নিয়মিত শ্রীস্বপনকুমারের “বাজপাখি সিরিজ”-এর সাপ্লাই পেতাম, আর সেগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। তখন ওই বইগুলো ব্যাপক লাগত। “দুই হাতে উদ্যত রিভলবার, আর অন্য হাতে জ্বলন্ত টর্চ লইয়া দীপক দত্ত শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন” পড়ে যা শিহরন জাগত মনে, তাতে গোয়েন্দামশাইয়ের হাতের গরমিলটা চাপা পড়ে যেত। মাথায় ফেল্ট টুপি, গায়ে ওভারকোট, চোখে কালো চশমা আর পাইপ খাওয়া সেই গোয়েন্দাদের খুব ভক্ত ছিলাম আমি। বাদলা রাতে অপরাধীদের ডেরায় হানা দিয়ে তাদের বিরাট চক্রান্তের জাল ভেদ করে শহরবাসীদের মুখে হাসি ফোটাতেন তারা, আর তাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ হলে আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম।

bk_1

শশধর দত্তের দস্যু মোহনের কার্যকলাপও খুব মন দিয়ে পড়তাম আমি। আমার ঠাকুর্দা ‘মোহন সিরিজ’-এর খুব ভক্ত ছিলেন, আর তাঁর থেকে নিয়ে আমিও প্রায় সবগুলো খন্ড পড়ে নিয়েছিলাম। মোহনের মধ্যে একটা রবিনহুডীয় ব্যাপার ছিল – ধনীদের সম্পদ কেড়ে নিয়ে গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা আমাকে খুব টানত। সেইসঙ্গে বৌ রমা, ছেলে স্বপন আর ড্রাইভার বিলাসকে নিয়ে ওর একটা ছিমছাম সংসারও ছিল। কলকাতা শহরের তদানীন্তন পুলিশ কমিশনার মিস্টার বেকার মোহনের শত্রু তো ছিলেনই, সেইসঙ্গে আমারও শত্রু হয়ে উঠেছিলেন। ‘মোহন সিরিজ’-এর একটা লাইন আমার খুব পছন্দের ছিল – “ কোথা থেকে কি হইয়া গেল বোঝা গেল না, কিন্তু মোহন দুই হাতের বাঁধন ছিন্ন করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল”।bk_2

হেমেন্দ্রকুমার রায়ের একাধিক গোয়েন্দাজুটি ছিল, তাদের মধ্যে কুমার-বিমল আর জয়ন্ত-মানিকের কথা মনে পড়ছে। ওদের নিয়ে লেখা গল্প-উপন্যাস, বিশেষ করে ‘যখের ধন’, ‘আবার যখের ধন’ ছোটবেলায় আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত।

এছাড়া পাঁচকড়ি দে বলে একজন গোয়েন্দাগল্প লিখতেন, কিন্তু সেগুলো ‘বড়দের বই’ বলে আমার হাতের নাগালের বাইরে রাখা হত। তবে তার মধ্যেও আমি পাঁচকড়িবাবুর দু-চারটে বই পড়ে ফেলেছিলাম, নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ-শিহরণ-আনন্দের স্বাদ পাওয়ার জন্য, তবে গল্পগুলো সেরকম ভাল লাগেনি।

কিন্তু বড় হওয়ার পরে বুঝলাম, বাজপাখি, মোহন, পাঁচকড়ি দে – এঁদের লেখা গল্পগুলোকে গোয়েন্দাগল্পের তকমা না দিয়ে বিদেশী সি-গ্রেড গল্পের অক্ষম বঙ্গীয় অনুকরণ বলাই ভাল। আসলে ততদিনে শার্লক হোম্‌স্‌ ধরে ফেলেছি, পোয়ারোর সঙ্গে অল্পবিস্তর আলাপ হয়েছে আর ফেলুদা-ব্যোমকেশকে ভালবেসে ফেলেছি। এছাড়া নীহাররঞ্জন গুপ্ত-র কিরীটিও ছিল। প্রথমদিকে কিরীটিকে ভালই লাগতো, তবে ব্যোমকেশ পড়ার পরে কিরীটির প্রতি আকর্ষণটা অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

গোয়েন্দা গল্পের প্রতি আমার প্রীতি দেখে আমার এক বন্ধু একবার নাক সিঁটকে বলেছিল, “কিসব ছাইপাঁশ পড়িস, গোয়েন্দা গল্প আবার সাহিত্য নাকি? ও তো যে কেউই লিখতে পারে!” বন্ধুর কথাটা, বলাই বাহুল্য, আমার একেবারেই মনঃপূত হয়নি। প্রথমত, যে কেউ গোয়েন্দাগল্প লিখতে পারেনা। নিপুণভাবে রহস্যের জাল বিস্তার করে সুষ্ঠুভাবে সেই জাল গুটিয়ে আনা সবার কম্ম নয়, তার জন্য ক্ষমতা লাগে। দ্বিতীয়ত, রোজকার দৈনন্দিন চর্বিতচর্বণ নিয়ে তিনশো পাতার গপ্প লেখাটাই বরঞ্চ তুলনায় অনেক সহজ বলে আমার মনে হয়। অবশ্য এটা একান্তভাবেই আমার ব্যক্তিগত মতামত, এবং এর সঙ্গে অনেকেই একমত হবেননা জানি।

ইংরেজী সাহিত্যে গোয়েন্দাকাহিনীর বিশাল স্টক, আর প্রবাসে থাকাকালীন সেই বিপুল সম্ভারের সঙ্গে খানিকটা পরিচয় ঘটেছিল। কিসব বাঘা-বাঘা গোয়েন্দা গল্প-লিখিয়ে, আর কত রকমারি তাঁদের প্লট! গোল্ডেন এজ-এর পোয়ারো, মার্পল, হোমস্‌, লর্ড পিটার উইম্‌সি, ইন্সপেক্টর ডার্গলিস, ইন্সপেক্টর ওয়েক্সফোর্ড, ব্রাদার ক্যাডভেল ফিলিপ মার্লো থেকে আরম্ভ করে হাল আমলের ইন্সপেক্টর রিবাস, ইন্সপেক্টর মর্স – কত বাঘা বাঘা গোয়েন্দা ঘর আলো করে রয়েছেন। রহস্যেরও কত রকমফের – মিস্ট্রি, থ্রিলার, মার্ডার মিস্ট্রি, লক্‌ড রুম মার্ডার মিস্ট্রি, পুলিস প্রোসিডিওরাল, কোজি মিস্ট্রি ইত্যাদি প্রভৃতি। পাবলিক লাইব্রেরী থেকে বই আনতাম আমি, আর সেখানে দেখতাম, শুধুমাত্র মিস্ট্রির জন্য আলাদা একটা ঘর বরাদ্দ থাকতো। আমার মতন রহস্যপ্রেমীদের কাছে সে ছিল এক মহাভোজ! ওই মহাসাগর থেকে কয়েক মগই মাত্র খেতে পেরেছিলাম আমি, সব যে ভাল ছিল তাও নয়, কিন্তু অপ্‌শন ছিল প্রচুর।

bk_3

কিন্তু বাংলায় গোয়েন্দার সংখ্যা বড্ড কম। তার চেয়েও বড় কথা, বাংলায় গোয়েন্দাগল্প লেখা হয় মূলত ছোটদের জন্য। পরাশর বর্মা, কল্কে-কাশি, ফেলুদা থেকে ইদানিংকালের অর্জুন (এখন মনে হয় রিটায়ার করেছেন), মিতিনমাসি, দীপকাকু, টুবলু-জগুমামা, প্রোফেসর নাট-বল্টু-চক্র – এরা সবাই ছোটদের জগতে নিজ-নিজ মহিমায় বিরাজ করেন। ছোটদের পূজাবার্ষিকী বইগুলোতে রহস্যকাহিনী একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে।

কিন্তু বড়দের জন্য খুব কম লেখকই গোয়েন্দাগল্প লিখেছেন। যাঁরা লিখেছেন, তাঁরাও স্বাদবদলের জন্যেই কলম ধরেছেন, তাঁদের মুনশিয়ানার ক্ষেত্র আলাদা। শুধুমাত্র গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস লিখে সংসার চালান, এরকম লেখক আছেন কি বাংলা সাহিত্যে? মনে হয় না। বাংলায় মনে হয় রহস্যকাহিনী এখনও কৌলীন্য পায়নি, লেখকদের মনোভাব হয়ত আমার সেই নাক-সিঁটকানো বন্ধুর মতন।

ভাগ্যিস শরদিন্দু ছিলেন! আমার মতন রহস্যপিপাসু পাঠকের জন্য ব্যোমকেশকে সৃষ্টি করেছিলেন। বাংলার শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দার ভোটটা আমি ওকেই দিয়ে থাকি। তবে ব্যোমকেশ ছাড়াও আমার আরো কিছু প্রিয় গোয়েন্দা আছেন। তাদের কথা একটু বলি।

সবার আগে বলতে হয় ব্যারিস্টার পি কে বাসু, বার-অ্যাট-ল এর কথা। নারায়ণ সান্যালের ‘কাঁটা সিরিজ’ আমার খুব প্রিয়। যদিও এই সিরিজের উপন্যাসগুলো সবই বিদেশী কাহিনীর ‘ছায়াবলম্বনে লেখা’(পেরি ম্যাসন আর আগাথা ক্রিস্টি), কিন্তু সান্যালমশাইয়ের কলমের জাদুতে সেগুলো খুবই উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

bk_4

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল নীলাদ্রী সরকারও আমার বেশ পছন্দের। কর্নেলের দুটো প্যারালাল সিরিজ আছে, একটা কিশোরদের জন্য, অন্যটা বড়দের জন্য। কিশোর সিরিজটা আগে পড়েছিলাম, এখন বড়দের সিরিজটা পড়তে গিয়ে দেখছি, তার আয়তন বেশ বিপুল, ষোলো না সতেরোটা খন্ড আছে। আপাতত তিনটে খন্ড পড়া হয়েছে। কয়েকটা উপন্যাস বেশ ভাল লেগেছে, কয়েকটা আবার খুবই দায়সারা করে লেখা, গোঁজামিল দিয়ে রহস্য মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বেশ কিছু সময় আগে অদ্রীশ বর্ধনের লেখা কয়েকটা উপন্যাস পড়েছিলাম। তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা ইন্দ্রনাথ রুদ্র ধুতি-পাঞ্জাবী পড়া, পাইপ এবং সুগন্ধী জর্দাপান খাওয়া একজন শৌখীন গোয়েন্দা। ইন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা গল্পগুলো বেশ ভাল লেগেছিল, একটা অন্যরকম স্বাদ ছিল সেগুলোতে।

মাঝখানে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় শবর দাশগুপ্ত নামে একটা গোয়েন্দা চরিত্র তৈরী করেছিলেন, এবং তাকে নিয়ে দু-তিনটে উপন্যাসও লিখেছিলেন।  গল্পগুলো ‘সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার’, তার ওপর শীর্ষেন্দুর লেখনী – তাই লেখাগুলো আমার বেশ ভাল লেগেছিল।  কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি সিরিজটা বন্ধ করে দিলেন, তাতে বেশ দুঃখই হয়েছিল আমার।

শেষ করার আগে বলি, বড়দের জন্য গোয়েন্দাগল্প আরো লেখা হোক। ইদানীংকালের কোনো লেখকই ব্যাপারটার দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণে অ্যাডাল্ট ক্রাইম ফিকশনের এই দুয়োরাণী দশা কি কোনোদিনই ঘুচবে না?

এই রহস্যের সমাধান কেউ করতে পারবেন কি?

(ছবি উৎসঃ গুগল্‌)