মৎস্যপুরাণ

মাছ প্রসঙ্গে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের সেই গল্পটা সবারই জানা। সেই যে নাসিরুদ্দিন একজন যোগীবাবার কাছে গিয়ে বলেছিলেন যে একটি মাছ একবার তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিল। সেই শুনে যোগীবাবা একইসঙ্গে কৌতূহলী হয়েছিলেন এবং ফ্রাস্ট্রু খেয়েছিলেন। কৌতূহলের কারণটা সহজেই অনুমেয়, আর ফ্রাস্ট্রু খাওয়ার কারণটা হল এই যে আজীবন সাধনা করেও তিনি নাসিরুদ্দিনের ওই লেভেলে উঠতে পারেননি। অনেকবার অনুরোধ-উপরোধ করার পরে অবশেষে মোল্লা রহস্যটা ভেঙেছিলেন এই বলে, “একবার খিদের চোটে প্রচন্ড কাহিল হয়ে পড়েছিলাম, তখন অনেক চেষ্টা করে একটা মাছ ধরে তাকে ভেজে খাই। তাতেই আমার প্রাণরক্ষা হয়”। যোগীবাবার রি-অ্যাকশনটা পাওয়া যায়নি, তবে খুব যে ভাল কিছু হবেনা, সেটা বলাই বাহুল্য।

ভাতমাছপ্রিয় বাঙালির প্রিয় স্লোগান ‘মৎস্য ধরিব খাইব সুখে’। এখন অবশ্য এই জেটগতির কর্পোরেট যুগে মাছ ধরার মতন সময় কারোর হাতেই নেই, তাই পুরনো স্লোগানটা বদলে গিয়ে ‘মৎস্য কিনিব খাইব সুখে’-তে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে খাওয়ার সুখ যে মাছেই, সেই ব্যাপারটা কিন্তু বদলায়নি। একটা বেশ বড় ত্রিভুজাকৃতি রুইমাছের গাদা, তার সঙ্গে একটা প্রমাণ সাইজের আয়তক্ষেত্র পেটি পাতে পড়লে যে স্বর্গীয় অনুভূতিটা হয়, সেটার জন্যেই তো বেঁচে থাকা। কোথায় লাগে এর কাছে পিজ্জা-পাস্তা-লাসাগ্‌না সম ম্লেচ্ছ খাবারদাবার?fish_2

মাছের প্রতি ভালবাসাটা আমি পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। ছোটবেলায় ছুটিছাটার দিনে বাবার সঙ্গে মাছ দেখতে যেতাম। মাছের বাজার মানেই কাদা-প্যাচপ্যাচে একটা ব্যাপার। আমার অবশ্য বেশ লাগতো। সেই কাদার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখতাম মাছওয়ালারা নানা ধরণের মাছ, আর নানা সাইজের আঁশবঁটি নিয়ে বসে খদ্দেরদের ডাকাডাকি করছেন। বড়-ছোট-মাঝারি বিভিন্ন সাইজের মাছ, জ্যান্ত-মড়া-বরফ দেওয়া বিভিন্ন অবস্থায় শোভা পাচ্ছে।

আমার পছন্দ ছিল রুই-কাতলা-মৃগেল জাতীয় বড় মাছ, বড় মাছে কাঁটা কম বলে। কাঁটাওয়ালা মাছ আমার একেবারেই অপছন্দ ছিল।

আমার অবস্থা দেখে বাবা বলতেন, “ওরে বোকা, যে মাছে যত কাঁটা, তার টেস্ট তত বেশি, বুঝলি?” শুধু বলেই ক্ষান্ত হতেন না অবশ্য, হাতেকলমে থিওরীটা প্রমাণ করার জন্য মাঝেমাঝেই প্রচুর কাঁটাওয়ালা মাছ নিয়ে আসতেন বাড়িতে। সেই সুবাদেই আমি খয়রা, খলশে, ফ্যাসা ইত্যাদি মাছ খেয়েছি। তবে কাঁটা ম্যানেজ করতে শিখে বুঝেছিলাম, বাবার থিওরীটা ভুল নয় মোটেই।

মাছ খাওয়ার ব্যাপারে আমি সর্বভুক – স্যামন থেকে শুঁটকি, সব খাই। অনেক মানুষ দেখেছি, যারা মাছের খুব ভক্ত হয়েও শুঁটকিটা এড়িয়ে চলেন, মূলত গন্ধের জন্য। শুনেছি শুঁটকি রান্না করার সময় বিকট গন্ধ বেরোয়, ঘরের লোকজন তো বটেই, পাড়া-প্রতিবেশীরাও নাকি বুঝতে পারেন যে আশেপাশে বৈপ্লবিক কিছু একটা রান্না করা হচ্ছে। ‘শুনেছি’ বলছি এইজন্য যে আমাদের বাড়িতে ওই গন্ধের কারণেই শুঁটকি রান্না হত না। তাই বলে আমাদের খাওয়া আটকাবে কে? মামাবাড়িতে যখনই রান্না হত, আমাদের ডাক পড়ত, আর নেহাৎই যেতে না পারলে আমার আর বাবার জন্য দুটো টিফিনবাটি চলে আসতো। মামীমা শুঁটকিটা অসাধারণ বানাতেন। ঝালের চোটে ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে যেত, আর চোখেরজলে-নাকেরজলে হয়েও আমি হাপুসহুপুস করে একথালা ভাত সাবড়ে দিতাম। মেজজেঠুর বাড়িতেও শুঁটকি রান্না হত, যেটা আসত আগরতলা থেকে। তার স্বাদ আলাদা, কিন্তু খেতে একইরকম দুর্দান্ত। আসলে শুঁটকির প্রিপারেশনের ভালত্বটা নির্ভর করে রাঁধুনীর ওপর। এর জন্য একটা আলাদা লেভেলের এলেম লাগে, যেটা সবার থাকেনা।

তবে দুঃখের কথা এই যে, দুটো বাড়িতেই এখন শুঁটকি রান্না বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে আমারও শুঁটকি খাওয়া গিয়েছে বন্ধ হয়ে।

বয়েসের সাথে সাথে আমার পছন্দের রেঞ্জটাও বাড়তে শুরু করেছিল। ছোট এবং মাঝারি মাছ যে রুই-কাতলাকে সমানে সমানে টেক্কা দিতে পারে, এমনকি তেমন আর্টিস্টের হাতে পড়লে স্বাদের ব্যাপারে ছাড়িয়েও যেতে পারে, সেটা বুঝতে শিখেছিলাম।

মৌরলা মাছের ঝাল আর টক – দুটোই খুব স্বাদু জিনিস, ভাজার কথা আর নাই বা বললাম! আমার কাকীমা কাচকি মাছের একটা শুকনো-শুকনো প্রিপারেশান বানান। কাকুর বাড়িতে বেড়াতে গেলে এই জিনিসটা যেদিন মেনুতে থাকে, সেদিন আমার অন্যকিছু না হলেও চলে, অদ্ভুত ভাল খেতে পদটা।

মাঝারি নয়, তবে ছোটর থেকে একটু বড়, সেরকম কয়েকটা মাছের স্বাদও অসাধারণ। আমোদি মাছ যেমন – কড়া করে ভেজে ডাল দিয়ে খেতে ব্যাপক লাগে। কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়ে পাতলা করে বানানো কাজলী মাছের ঝোল, যেরকম উপাদেয়, সেরকমই স্বাস্থ্যকর।

মাঝারি মাছের ভ্যারাইটি প্রচুর। পার্শে, পাবদা, ট্যাংরা, তেলাপিয়া, বাটা, বেলে, রূপচাঁদা, কৈ – নাম বলে শেষ করা যাবেনা। এইসব মাছ হাল্কা ঝোলের চেয়ে শর্ষেবাটা কিংবা পেঁয়াজ দিয়ে জমে ভাল। তবে এদের মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয় হল ট্যাংরা, পার্শে আর পাবদা। এই তিনটে মাছ মাঝারি এবং বড়, দুই সাইজেই পাওয়া যায়, এবং বানানোর রকমফেরে স্বাদও বদলে বদলে যায়।

ট্যাংরার কথাই ধরা যাক। ডিমভরা বড় সাইজের ট্যাংরা শীতকালে পেঁয়াজকলি দিয়ে বানালে ফাটাফাটি লাগে। যাঁরা স্বাস্থ্য বজায় রাখতে চান, তাঁরা বেগুন দিয়ে পাতলা ঝোল বানিয়ে খেতে পারেন, খারাপ লাগবে না।

fish_3

পাবদার ওপর আমার একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে। পাবদারও নানারকম প্রিপারেশান হয়, তবে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়ে বানানো বড় সাইজের পাবদার ঝোলটা। থালা জুড়ে শুয়ে থাকা একটা পাবদা দেখে মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয় আমার।

শীতকালে আমার আর একটি প্রিয় পদ হল আলু-ফুলকপি দিয়ে বানানো তেলাপিয়া কিংবা কৈ মাছের ঝোল, আর নামানোর আগে তাতে কিছু ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। কৈ মাছের আর একটা খুব বিখ্যাত প্রিপারেশান আছে – তেল কৈ, কিন্তু কেন জানিনা, ওটা আমার ওভারহাইপড্‌ বলে মনে হয়।

এতটা যদি কেউ পড়ে ফেলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন যে বিদেশে যাওয়ার সময় যখন সবাই আমাকে “ওখানে মাছ পাওয়া যায়না কিন্তু!” বলে ভয় দেখিয়েছিল, তখন আমার মনের অবস্থা কি হয়েছিল! কিন্তু অকুস্থলে পৌঁছে দেখলাম, ব্যাপারটা আদপেই সেরকম নয়। দেশীয় মাছ তো পাওয়া যেতই, সঙ্গে বিভিন্ন রকমের বিজাতীয় সামুদ্রিক মাছও মিলত। দেশীয় মাছের ক্ষেত্রে একটা অসুবিধে অবশ্য ছিল – সেগুলো বেশ পুরনো, আর অতদিন বরফে থাকার ফলে তাদেরকে মার্ডার ওয়েপনও বলা যায়, কিন্তু ওইটুকু অসুবিধের সঙ্গে আমি অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিলাম।

বিজাতীয় মাছগুলো অবশ্য প্রায় সবই নতুন ছিল আমার কাছে। টুনা, স্যামন, সোয়াই, ম্যাকারেল, সার্ডিন, বাসা, কিংফিস – এইসব মাছগুলো হুলিয়ে খেয়েছিলাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল টুনা মাছের তরকারি। টুনা জিনিসটা সাধারণত ক্যানে পাওয়া যেত, ক্যানের ভেতরে জলের মধ্যে ছোট ছোট সেদ্ধ টুনার টুকরো। আমেরিকানরা ওই স্বাদহীন সেদ্ধ জিনিসটাই সোনামুখ করে খেয়ে নিত। কিন্তু আমি ব্যাপারটা নিয়ে একটু পাকামি করতাম। পেঁয়াজ-রসুন-কাঁচালঙ্কা অল্প তেলে খানিক নেড়েচেড়ে, দরকারমতন মশলাপাতি দিয়ে, তার মধ্যে ওই টুনার টুকরোগুলো ফেলে দিতাম, একটা মাখামাখা তরকারি তৈরি হত, আর নামানোর আগে খানিক ধনেপাতা। প্রথম যেদিন পদটা খেয়েছিলাম, একদম ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের রান্না বলে বলছি না, উৎসাহীরা ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

স্যামন মাছও নানারকমভাবে বানিয়ে খেতাম – শর্ষে-স্যামন, বেক্‌ড স্যামন, স্যামনের ঝাল, গ্রিল্‌ড্‌ স্যামন – একেকটা পদের একেক রকম স্বাদ, আর প্রতিটাই ভাল খেতে। এছাড়া ওখানকার পমফ্রেট মাছগুলোও স্পেশাল ছিল। অত বড় পমফ্রেট তার আগে আমি চোখেই দেখিনি, খাওয়া তো দূর অস্ত! থাইল্যান্ড থেকে আসত তারা, আর একেকটার ওজন ছিল প্রায় হাফকেজি ! আমরা ‘রাক্ষুসে পমফ্রেট’ বলতাম। তার স্বাদ ছিল বড় ভাল, এখনও মুখে লেগে আছে।

শেষ করি বাঙালির আরেকটি চিরকালীন ফেবারিট মাছের কথা বলে। সেই মাছকে ভেজে, বেগুন দিয়ে ঝোল করে, শর্ষে দিয়ে ভাপা করে, কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে – যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন, তার রেজাল্ট অনবদ্য ছাড়া আর কিছু হতেই পারেনা। যে তেলে তাকে ভাজা হয়, সেই তেল দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ার মধ্যেও একটা অদ্ভুত রোমান্টিসিজম্‌ আছে।

সাধে কি আর টিউবলাইট কোম্পানীর একটা পুরনো অ্যাডের স্লোগান ছিল –

“বাতির রাজা ফিলিপ্স, আর মাছের রাজা ইলিশ”?

fish_4(ছবি উৎসঃ গুগ্‌ল্‌)

8 thoughts on “মৎস্যপুরাণ

  1. কুন্তলা ডিসেম্বর 13, 2014 / 7:50 পুর্বাহ্ন

    খুব ভালো লাগল, অরিজিত। এত ভালো লাগল যে সবে খেয়ে উঠেও খিদে পেয়ে যাচ্ছে।

    • অরিজিত ডিসেম্বর 13, 2014 / 11:15 পুর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ কুন্তলা। 🙂
      লেখাটা ভাল লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগলো।

  2. Sidhu Mukujjey ডিসেম্বর 14, 2014 / 1:27 অপরাহ্ন

    ekdom jivey jol ana moto presentation…… ekta mach miss kore geli..Bhetki mach… boro sussadhu… same as Ilish, ki paturi , ki shorshe, ki fulkopir jhol ..sobetei ononno…. Plate e pabda r explanation ta onoboddo…ekdom moner kotha 🙂

    • অরিজিত ডিসেম্বর 14, 2014 / 5:58 অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ বন্ধু, ভাল লাগার জন্য। 🙂
      ভেটকীটা সত্যিই মিস্‌ করে গিয়েছি, বাজে মিস্‌। 🙂

  3. Anusia ডিসেম্বর 15, 2014 / 5:09 অপরাহ্ন

    Mach amar o khub priyo. Ilish, bhetki paturi, katlar kalia,laute shutki ,tangra r o vibinno dhoroner mach.

  4. অরিজিত ডিসেম্বর 15, 2014 / 9:16 অপরাহ্ন

    খুব ভাল লাগলো শুনে যে মাছ আপনার খুব প্রিয় অনুসূয়া। 🙂
    কমেন্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ। 🙂

  5. Sujan এপ্রিল 17, 2015 / 2:56 অপরাহ্ন

    lekhar gune jibe jol / cingri elish moner bol

  6. অরিজিত এপ্রিল 17, 2015 / 10:52 অপরাহ্ন

    একদম সত্যি কথা বলেছিস। 🙂

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s