পিকে

আন্তোনিও হাবাস নাকি রাজকুমার হিরানি?

লুই গার্সিয়া নাকি আমির খান?

অ্যাটলেটিকো ‘ড্র’ কলকাতা নাকি ‘পিকে’?

ফুটবল নাকি সিনেমা?

এই নিয়ে গতকাল সকাল থেকে প্রচুর ভাবনাচিন্তা করার পরে বেলার দিকে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম। চুপচাপ টিকিট কেটে পাঁচটার শো-য়ে চলে গেলাম সিনেমা দেখতে।

রাজকুমার হিরানির সিনেমা আমার ভাল লাগে। আদ্যপান্ত কমেডির রসে চোবানো গল্পের মাধ্যমে ভদ্রলোক আমাদের কিছু তেতো, কড়া এবং অপ্রিয় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন, যেগুলোর সঠিক জবাব অনেকক্ষেত্রেই আমাদের কাছে থাকেনা। রাজু হিরানির গল্পের আরো একটা বৈশিষ্ট হল, তাঁর গল্পের প্রোটাগনিষ্টরা সবাই লুচ্চা-লাফাঙ্গা-বখাটে টাইপের, অন্তত সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর কাছে।

‘পিকে’ ছবিটাও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে অবশ্য মানুষের বদলে তিনি বেছে নিয়েছেন একজন ভিনগ্রহের প্রাণীকে, যাকে দেখতে মানুষের মতই, তফাৎ বলতে তার কানগুলো বেশ বড়-বড়। পৃথিবীতে মানুষ আছে, এই সন্ধান পেয়ে প্রাণীটিকে তাদের গ্রহ থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয় মানুষদের নিয়ে গবেষণা করার জন্য।

pk_1

কিন্তু পৃথিবীতে নামার পরপরই বিপত্তি! রাজস্থানে মহাকাশযান থেকে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক গ্রামবাসী প্রাণীটির গলা থেকে তার বাড়ি ফেরার রিমোটটি ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। এতে ভিনগ্রহের সেই প্রাণী পড়ে মহা মুশকিলে। রিমোট না পেলে বাড়ি ফেরার পথ বন্ধ, তাই গরু খোঁজা বন্ধ করে সে শুরু করে রিমোট খোঁজা। এই রিমোট খুঁজতে গিয়ে সে যা অভিজ্ঞতা এবং সমস্যার সম্মুখীন হয়, সেটা নিয়েই গল্প।

ভারতবর্ষের মানুষজন, তাদের নানা বৈচিত্র্য, আচার-আচরণ, হাবভাব ইত্যাদি দেখে ব্যোমকে যায় বেচারা। সেইসঙ্গে তার চোখে পড়ে এখানকার প্রচুর অসঙ্গতি, যেগুলো দেখে সে হয়ে যায় ‘কনফুজ’, আর তার মাথার ‘ফুজ’ যায় উড়ে। কিছুদিনের মধ্যেই একটা ব্যাপার সে বুঝে যায় – এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হচ্ছে ‘ভগবান’ নামক এক ব্যক্তি, যে নাকি সামান্য কিছু দক্ষিণার বদলে মানুষের সব প্রার্থনা পূর্ণ করে দেয়। তখন সেও ভগবানের দ্বারস্থ হয় রিমোটের জন্য, কিন্তু হাজার অনুরোধ-উপরোধ করেও প্রার্থিত বস্তুটি তার হস্তগত হয়না। বেচারার অদ্ভুত কান্ডকারখানা দেখে লোকে তার নাম দেয় পিকে, অর্থাৎ যে কিনা সবসময় ‘খেয়ে’ থাকে।

এইরকম অবস্থায় তার সঙ্গে পরিচয় হয় জগ্‌গু, ওরফে জগৎজননীর সঙ্গে। পেশায় টিভি জার্নালিষ্ট এই মেয়েটি পিকে-কে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনোর ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। শুরু হয় দুজনের রিমোট অভিযান।

pk_2

হিরানির অন্যান্য সিনেমাগুলোর মতন এই ছবিটাও মূলত কমেডি। কিছু অত্যন্ত ভাল হাসির মুহুর্ত আছে, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে সেসব দেখে। তার মধ্যে মধ্যেই আবার কিছু অন্য দৃশ্যও আছে, যেগুলো দর্শককে ভাবাবে। ধর্ম এবং ধর্মগরুদের(থুড়ি, ‘ধর্মগুরু’)নিয়ে কিছু বক্তব্য আছে। ধর্ম, যা কিনা আদতে ধারণ করার জিনিস, সেটাই এইসব গরুদের হাতে পড়ে সাধারণ মানুষকে শুধুই বারণ করে নিজের কর্তব্য করতে, আর উস্কানি দেয় মারণযজ্ঞে মেতে উঠতে। একজন ভিনগ্রহের প্রাণী হয়েও পিকে বুঝতে পারে আসল আর নকল ভগবানের ফারাকটা, যেটা আজন্ম এই গ্রহে থেকেও আমরা বুঝতে পারিনা। ভন্ড গুরুদের বাদ না দিয়ে, উল্টে সেই গুরুবাদকেই আঁকড়ে ধরে আমরা চোখ বুজে থাকি। ধর্ম আর ভগবানকে বোঝা হয়না, গুরুর চাপিয়ে দেওয়া বোঝা বয়ে বয়েই আমাদের জীবন কেটে যায়, আর গুরুকুল আমাদের এপ্রিল ফুল বানিয়ে তুমুল খিল্লী নেয়। হাসিঠাট্টার মাধ্যমে ভন্ডামির এই ব্যাপারস্যাপারগুলো হিরানি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

অভিনয়ে সবাইকেই ভাল লেগেছে। ক্যামিও রোলে সঞ্জয় দত্তকে ভাল লাগে। সুশান্ত সিং রাজপুতও ছোট্ট ভূমিকায় কাঁপিয়ে দিয়েছেন। জগ্‌গুর সঙ্গে তাঁর ইন্ট্রো সিনটা আমার ব্যাপক লেগেছে। ছেলেটাকে দেখতেও বেশ মিষ্টি লেগেছে এই ছবিতে।pk_3

বোমান ইরানী এবং পরীক্ষিত সাহানি যথারীতি ভাল অভিনয় করেছেন।

গুরুর ভূমিকায় সৌরভ শুক্লাও ব্যাপক। এই ভদ্রলোক খারাপ অ্যাক্টিং করতে জানেনই না। নরমে-গরমে-নোন্‌তায়-মিষ্টিতে একদম খাপেখাপ-পঞ্চুরবাপ।

তবে এই ছবিতে আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে অনুষ্কা শর্মাকে। মেয়েটাকে বড্ড মিষ্টি দেখতে, আর অভিনয়টাও খারাপ করেনা। হেসে, গেয়ে, নেচে, কেঁদে একদম মাতিয়ে দিয়েছে জগ্‌গু। পিকে-র সঙ্গে বিদায় দৃশ্যটা জাস্ট ফাটাফাটি।

পড়ে রইল কে?

পিকে, আবার কে?

আমির খানকে নিয়ে মনে হয় নতুন করে আর কিচ্ছু বলার নেই। অন্যদের আছে কিনা জানিনা, আমার তো নেই। লোকটার অভিনয় দেখে এককালে মুগ্ধ হতে হতে ‘বোর’ হয়ে গিয়ে এখন আর হইনা। অ্যাক্সেন্ট থেকে শুরু করে ম্যানারিজম, সবেতেই তুখোড় লেগেছে পিকে-কে।

ছবির গানগুলো খুব ভাল। অনেকদিন পরে শান আর সোনু নিগমকে পেলাম, মন ভরে গেল। শান্তনু মৈত্রের সুরও বড়ই মিষ্টি।

সব মিলিয়ে সিনেমাটাকে চার দেব পাঁচে। শেষের দিকটায় একটু বলিউডি মেলোড্রামা আছে বলে আধ নম্বর বাদ। বাকি আধ নম্বরের জন্য দায়ী বছর দুয়েক আগের একটা সিনেমা, যার নাম ‘ওঃ! মাই গড’। ধর্ম এবং নকল ভগবানের অন্তঃসারশুন্যতা নিয়ে তৈরি হওয়া এই সিনেমাটা যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন, আর যাঁরা দেখেননি, তাঁরা দেখলে বুঝবেন। এই বিষয়ে এটা একটা ‘কাল্ট’ সিনেমা।

পুনশ্চঃ বাড়ি ফিরে শুনলাম, কলকাতা আইসিএল জিতেছে। যাক্‌ বাবা, টুর্নামেন্টটা শেষ হল তাহলে ফাইনালি!

(ছবি উৎসঃগুগ্‌ল্‌)

3 thoughts on “পিকে

  1. সৌরাংশু ডিসেম্বর 22, 2014 / 8:35 পুর্বাহ্ন

    The Man who sued the God….. একটি অস্ট্রেলীয় সিনেমা। তার উপর নির্ভর করে ওহ মাই গডের গুজরাতি বাবা নাটকটি। তারপর ওহ মাই গড। আমিও ফিসফাসে পিকে নিয়ে লিখব বটেক… 🙂 ভালো হইসে।

    • অরিজিত ডিসেম্বর 22, 2014 / 9:17 অপরাহ্ন

      তথ্যগুলোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। 🙂
      কমেন্ট করার জন্য একটা বোনাস ধন্যবাদ জানালাম। 🙂

  2. Anirban Halder ফেব্রুয়ারি 26, 2015 / 1:17 পুর্বাহ্ন

    Aha ki sawhoj sabolil lekha! Audience review thik jemonti hawoar kawtha. Besh laglo bawte. PK-er ayakta dialogue amar amader bohu porichito ayakjonke mone koriye diyechhe. Oi je, PK jekhane bollo “..hamare kitne saare bachchha footpath mein bhookha pada hain. Doodh unko pilao…”. Oi manushtio awnekta ayamoni bolechhilen “Bohurupe sawmmukhe tomar/ Chhari kotha khunjichho ishwar/ Jibe prem kawre jei jon/ Sei jon sebichhe ishwar.” Kawthata awnekdin online likhbo likhbo korchhilam. Ei sujog-e likhei phellam.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s