চোদ্দ সালের চচ্চড়ি

অবশেষে বছরটা শেষ হতে চলেছে। একখানা ঘ্যামা বছর গেল বটে! সেই যে পয়লা দিনে কোথাকার কে এক কোরি অ্যান্ডারসন দুম করে আফ্রিদির রেকর্ডটা ভেঙ্গে দিল, তখনই বোঝা গিয়েছিল, একটা ধামাকাদার বছর আসতে চলেছে! বেচারা আফ্রিদি! ছেলেটা, থুড়ি লোকটা, নাকি ভেবেছিল ওর জীবদ্দশায় রেকর্ডটা অক্ষত থাকবে, অন্তত যদ্দিন খেলবে, তদ্দিন কোনো চাপ আসবে না। কিন্তু ভাগ্য খারাপ, তাই প্রথম দিনেই মগে জল হয়ে গেল।

কোরি অ্যান্ডারসন যেরকম সামান্য বোড়ে থেকে হঠাৎই রাজার আসনে চড়ে বসেছিল, সেরকম আমাদের দেশের একজন মহাপ্রাণও মেট্রোয় চেপে খোদ রাজধানীর পালের গোদা হিসেবে শপথ নিতে গিয়েছিলেন। সেটা অবশ্য গত বছরের একেবারে শেষদিকের ঘটনা। তাঁর এই ‘নায়কোচিত’ ব্যবহারে বীরপূজোয় অভ্যস্ত দেশের আমজনতা ‘শেষরাতের ওস্তাদ’ খেতাবটা তাঁকেই দিয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই না, ভরপেট বার খাইয়ে একেবারে কুতুব মিনারের টঙেও তুলে দিয়েছিল।

কিন্তু নতুন বছরের গোড়া থেকেই সব গন্ডগোল হয়ে গেল। নীল মাফলার জড়িয়ে রাজধানীর ফুটপাথে লাট খেয়ে, ভুলভাল কথাবার্তা বলে এবং আরো নানারকম নাটক করে কেজরীওয়াল তখন এই আমজনতার কাছেই “খুজলীলাল” হিসেবে পরিচিত হয়ে গেলেন। আমাদের বাজারী পত্রিকা তো শপথের পরেই তাঁকে ‘অগ্রবাল’ আখ্যা দিয়ে দিয়েছিল, আর তিনিও সেই নামকরণের মান রাখার জন্য সুযোগ বুঝে শুভক্ষণ দেখে সর্বাগ্রে পদত্যাগ করলেন। দিনটা ছিল ‘প্রেমদিবস’, অর্থাৎ কিনা ভ্যালেন্টাইন্‌স ডে! বাজারী পত্রিকার দেওয়া নামের শেষাংশটা খুব সুন্দরভাবে সার্থক করলেন তিনি।

এই বছরে মেগা ইভেন্টের ছড়াছড়ি ছিল। বার্ষিক সার্কাস হিসেবে আইপিএল, তাতে আবার কলকাতার নাইটরা জিতেছিল। কলকাতাবাসীকে আর পায় কে? আমাদের দিদি এমনিতেই হুল্লোড় ভালবাসে, আর উপলক্ষ্য পেলে তো কথাই নেই! জমিয়ে একটা মোচ্ছব হয়েছিল, তাতে ঝিঙ্কু মামণিরা নেচেছিল, আর ক্যাবলাকান্ত হিরোরা দাঁত কেলিয়েছিল। ঝিঙ্কু মামণিদের ‘ঝিঙ্কু মামণি’ বলাতে তারা রেগেও গিয়েছিল, কদিন একটু খুচরো বাওয়াল হয়েছিল, পাবলিক চেটেপুটে সেসব খেয়েওছিল।

তবে মেগাতর ইভেন্ট ছিল দুটো। প্রথমটা লোকসভা ভোট, যাতে বউকে ত্যাগ দেওয়া একদা চা-বিক্রেতা ছাপান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতিওয়ালা লোকটা দেশের সর্বেসর্বা হয়েছে। ‘নমো, নমো’ ধ্বনিতে সারা দেশ একদম হেলে গিয়েছে। শুধু কি নিজের দেশ, স্যামচাচার দেশের পার্কে গিয়েও লোকটা এমন ভাষণ দিয়েছে যে দো-আঁশলা আম্রুগুলোও হুব্বা হয়ে গেছে। এই মালগুলোই আগে ‘নমো’-কে এন্ট্রি দিচ্ছিল না মার্কিনমুলুকে, ভাবা যায়?

নমো লোকটার কিছু ক্যালি আছে মাইরি! সিংহাসনে একটু গুছিয়ে বসার পরেপরেই সমাজের হনু লোকেদের হাতে ঝাঁ-চকচকে নতুন ঝাঁটা ধরিয়ে দিয়েছে। রাস্তা পরিষ্কার কর শালারা, সমাজে কিছু কন্ট্রিবিউশন তো কর্‌, শুধু খেয়েদেয়ে জনগণের অন্ন ধ্বংস করলে হবে? হনুরাও নতুন ঝাঁটা পেয়ে খুব খুশি, বিগলিত-করুণা-জাহ্নবী-যমুনামার্কা হাসি নিয়ে নিজেদের হরি কুমোর ভাবছে আর ঝাড়ু মারছে। দেখেও সুখ!

ইতিহাস হেরোদের কোনোদিন মনে রাখেনি, কিন্তু এক্ষেত্রে অপোনেন্ট পার্টির ‘চিরশিশু’টিকে একেবারে ভুলে গেলে অন্যায় হবে। আধদামড়া বয়েসেও মনটাকে যে এরকম সরল রাখা যায় – তাও আবার রাজনীতির মতন একটা কুটিল ফিল্ডে – সেটা ও-ই দেখিয়েছে। মামাবাড়ির পাড়ায় গন্ডোলায় চেপে আরামে দোল না খেয়ে ছেলেটা এই পোড়া দেশের গন্ডগ্রামে গিয়ে মা-বোনেদের সঙ্গে ভুট্টা খেয়েছে, তার একটা কোনো দাম নেই? জেতাটাই কি সব? নাহয় মশার কামড় খেয়ে বিরক্ত হয়ে দু’চারটে ছোটবড় কথা বলেই ফেলেছে, সবসময় কি মেজাজ ঠিক রাখা যায় নাকি? রাহুর দশা কাটিয়ে ছেলেটা ঠিক একদিন হুল ফোটানোর জন্য ফিরে আসবে, তখন সব বাছাধনেরা মজা টের পাবে।

দ্বিতীয় মেগাতর ইভেন্টটা ছিল ফুটবল বিশ্বকাপ। সেটাও বেশ মাখো-মাখো হয়েছিল। মেসির জাদু, ভ্যানপার্সির উড়ন্ত হেড, রোনাল্ডোর ধ্যাড়ানো, রবেনের ডাইভ, জুনিগার গুঁতো, সবার ওপরে হোস্টদের সাত-কোর্স সেমিফাইনাল ডিনার – কি না ছিল! এন্টারটেনমেন্টের চূড়ান্ত যাকে বলে!

বছরের শেষদিকে একটা আইএসএল-ও হয়ে গেল কচি করে। টুর্নামেন্টের ফর্ম্যাটটা বিদেশী, অনেক প্লেয়ারও বিদেশী তবে স্ট্যান্ডার্ডটা ওই টালিগঞ্জ বনাম সোনালী শিবিরের মতন। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই, এই টুর্নামেন্টটাই নাকি অদূর (নাকি সুদূর) ভবিষ্যতে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল স্তরে কুলীন হয়ে উঠতে সাহায্য করবে, যদি না অবশ্য ততদিনে আইএসএল নিজেই বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু আশা রাখতে ক্ষতি কি? কথায় আছে, আশায় বাঁচে চাষা!

অবশ্য দিনকাল যা পড়েছে, তাতে বাঁচা ব্যাপারটা বেশ চাপের হয়ে যাচ্ছে। কখন কার যে কি হবে, কিছুই আগে থেকে বলা যায় না। নইলে মাঝ-আকাশ থেকে একটা আস্ত এরোপ্লেন বেমালুম উবে গেল, আর এগারো মুলুকের জলপুলিশ-স্থলপুলিশ মিলেও তার একটা কিনারা করতে পারলো না? আবার সেই একই কোম্পানীর এরোপ্লেনে চেপে যাচ্ছিল কিছু কেষ্টর জীব, হঠাৎ করে একটা মিসাইল এসে প্লেনে গোঁত্তা মেরে সবাইকে সাবাড় করে দিল! আরো অবাক ব্যাপার, মিসাইলটা নাকি ‘ভুল করে’ ছোঁড়া হয়েছিল, লক্ষ্য ছিল অন্যকিছু। ভুলের কি মহিমা! মাত্র দুশোটা প্রাণের তো ব্যাপার, এ নিয়ে এত হল্লাহাটির কি আছে?

ছেলেবেলায় একটা গল্প পড়েছিলাম। সেই যে একটা ভেড়া ঝর্ণায় জল খেতে এসেছিল, আর একটা নেকড়ে তাকে মেরে ফেলেছিল এই বলে যে জলটা সে ঘোলা না করলেও তার বাবা করেছে। এই ঘটনাটাই আরো বড় আকারে ঘটল মাত্র কিছুদিন আগে, প্রতিবেশী দেশের এক স্কুলে। বিশদে গিয়ে লাভ নেই, কিন্তু এই ২০১৪ সালেও এসব ঘটনা ঘটে, যার ফলে একটা স্কুলের নবম শ্রেণীতে মাত্র একজন ছাত্র রয়ে যায় ক্লাস করার জন্য! এর থেকে আদিম যুগটাই ভাল ছিল না কি, যখন মানুষ গুহায় থাকতো আর মাংস ঝল্‌সে খেত? তারা অন্তত ধর্মের বর্ম পড়ে কুকর্ম করত না!

একটু লোকালে ফিরি। বঙ্গদেশের নিত্যনতুন রঙ্গ দেখে মনে এমন পুলক জাগে যে আজকাল কপিল শর্মা নাইট্‌স্‌ আর দেখতে হয়না! গত দুবছর ধরে বাংলার অবিংসবাদী নায়ক, আমার মতে, সুদীপ্ত সেন। লোকটা মাইরি ক্ষণজন্মা। কোন্‌ শালা বলে বাঙালি শুধু মাছি মারে? সুদীপ্তকে যতবার দেখি, আর ওর কথা যতবার পড়ি, বুকের ছাতিটা গর্বে দুই ইঞ্চি করে বেড়ে যায়। এই বছরও মাঝেমাঝে দু’একটা মিসাইল ছেড়েছে, তার ঠ্যালা সামলাতে দিদি, দাদা, দিদির ভাই, দিদির ভাইপো হালে পানি পাচ্ছে না। এদ্দিন জেলে থেকেও লোকটার গ্ল্যামার একটুও টস্‌কায়নি। ইতিহাস বইতে ওর নামে একটা চ্যাপ্টার বরাদ্দ করা উচিৎ, ভাবীকাল কিছু শিখতে পারবে।

তবে এই বছরের পার্শ্বচরিত্ররাও কিন্তু কেউ ফ্যালনা নয়। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের রেঞ্জটা। অভিনয়, খেলাধূলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা – সবেতেই অন্তত একজন রাজ্যের নাম উজ্জ্বল করেছেন। তাপস পালের কথাই ধরা যাক। ‘দাদার কীর্তি’ সিনেমায় একগলা জলে দাঁড়িয়ে চিঁচিঁ করতে থাকা আলুভাতেমার্কা তাপস যে জনসমক্ষে এরকম একটা মারকাটারি স্পিচ দিতে পারে, কেউ কোনোদিন ভাবতে পেরেছিল? অভিজিৎ চক্রবর্তী আরেকজন। ভাল কাজ করতে গেলে যে কিছু খুচরো বাওয়াল সামলাতে হয়, সেটা তিনি জানেন। তাই তাঁর বিরুদ্ধে যে যতই গর্জন করুক না কেন, চক্কোত্তিমশাই জানেন যে তাঁকে বর্জন করার ধক্‌ কারুর নেই। তাই তিনিও নীলকন্ঠ হয়ে নির্বিকল্প নিয়েছেন, মরুক শালারা চিল্লিয়ে! আমাদের কাকশিল্পীর কথা ভুললেও চলবে না। ছোট, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোলে ছিলেন তিনি এই বছর। ‘দেবকৃপা ব্যাপার’-এর মতন এরকম ঘাপলামার্কা একটা ব্যাপারকেও তিনি দিদিকৃপায় সামলে নিয়েছেন, ক্যালি না থাকলে হয়? চোখের সামনেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অথচ তাঁর টিকিটিও কেউ ছুঁতে পারছে না।

তবে একজন ট্র্যাজিক চরিত্র আছেন বটে। তিনি কুণালবাবু। অনশন, ঘুমের বড়ি জাতীয় সেন্টুমার্কা ব্যাপার পাবলিক আজকাল আর খায় না। নিরূপা রায়ের যুগ চলে গেছে, সেটা তাঁর বোঝা উচিৎ। তাই নতুন বছরে এইসব সস্তার যাত্রাপালা বন্ধ করে তাঁর উচিৎ নতুন কিছু ভাবা, যাতে কিছু কাজের কাজ হয়।

অনেক ভাটবাজি হল, এবারে গুটোই। তবে যাওয়ার আগে বলি, ২০১৫ সালে লোকজনকে অভিবাদন জানাবার আগে আমি অন্তত একটু সাবধানতা অবলম্বন করব। যা চলছে চারদিকে, তাতে এতকাল যাকে ‘নমস্কার’ বলে এসেছি, সে হয়ত বেমক্কা ‘আস্‌সালাম আলাইকুম’ বলে বসল, বা ‘মে গড ব্লেস ইয়ু’ বলা ফাদার হঠাৎ করে ‘ভজগৌরাঙ্গ’ জপতে শুরু করল। এখানে সবই সম্ভব।

যা বিচিত্র এই দ্যাশ, সব শালা ড্যাশ, ড্যাশ, ড্যাশ।

বর্ষপূর্তির আগাম শুভেচ্ছা! জয় হিন্দ!!

Advertisements

13 thoughts on “চোদ্দ সালের চচ্চড়ি

  1. Maniparna Sengupta Majumder ডিসেম্বর 29, 2014 / 5:27 পুর্বাহ্ন

    Darun laaglo…Shei chhoTobelay “World This Week” hoto..awnekta seirokom..”World This Year” ….:-D..tawbe Rahul kiaar hool foTate paarbe….:-P…byachara… dukku hoy… 😦

    • অরিজিত ডিসেম্বর 29, 2014 / 7:48 অপরাহ্ন

      ভাল লেগে কমেন্ট করার জন্য অনেক ধন্যবাদ 🙂
      রাহুলের ব্যাপারটা একটা ফিকশন। 😛

      • Maniparna Sengupta Majumder ডিসেম্বর 29, 2014 / 8:33 অপরাহ্ন

        ছি ছি … অ্যামন অপমান 😦 😀

    • অরিজিত ডিসেম্বর 29, 2014 / 7:48 অপরাহ্ন

      খুব ভাল কাটবে সুখেন্দু। 🙂
      আপনাকেও অনেক শুভেচ্ছা জানালাম। 🙂

  2. tubaibanerjee ডিসেম্বর 29, 2014 / 8:04 অপরাহ্ন

    Darun lekha hoyechche , charchari ta talk misti jaal hoyechche. tai charchari ta bhalo laglo . naba barshe subehchca rolio agam

  3. অরিজিত ডিসেম্বর 29, 2014 / 10:09 অপরাহ্ন

    তোকেও অনেক শুভেচ্ছা জানাই, আগাম। 🙂
    কমেন্টের জন্যও একটা ধন্যবাদ।

  4. Sidhu Mukujjey ডিসেম্বর 30, 2014 / 5:58 অপরাহ্ন

    Konta chere konta r kotha bolbo…. puro bochor ta ekta pocket diary baniey pesh korechis…. sudhu bhagne Madan ta baad roe gelo..onek anondo pelam…chaliye jao

    • অরিজিত ডিসেম্বর 30, 2014 / 8:26 অপরাহ্ন

      আনন্দ পেয়েছিস জেনে খুব ভাল লাগলো। তোরা আনন্দ পেলেই আমারও আনন্দ। 🙂

  5. roshni জানুয়ারি 3, 2015 / 3:39 পুর্বাহ্ন

    Besh laglo pore. Highlight ta bhalo jomechhey. tobe madan dada ke completely bad diye dilen? poschimbonger prothom jailjatri montri bole kotha. Onar o to ektu jayga prapyo chhilo ekhane.

    • অরিজিত জানুয়ারি 8, 2015 / 7:37 অপরাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ রোশনী। 🙂
      মদনবাবুকে বাদ দেওয়াটা ভুল হয়ে গেছে, আসলে ওঁর সম্পর্কে বলতে গেলে আর একটু বড় পরিসর দরকার মনে হয়, এই অল্প জায়গায় উনি কুলিয়ে উঠবেন না। 😀

  6. Meghpeon জানুয়ারি 4, 2015 / 6:03 অপরাহ্ন

    lekhata ajke porlam..ajkal ektu byastota bereche, tai roj bosha hoye othey na…tobe khil khil hashchi lekhata pore..thik lekhatay bola ‘chiroshihu’ r moto 😛 arekta kotha, lekhata porte porte mone porlo, june maliya ar shahid afridi jeno somogotriyo!

    • অরিজিত জানুয়ারি 5, 2015 / 6:44 অপরাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ পৌষালী। কমেন্ট পেয়ে খুব ভাল লাগলো। 🙂
      জুন মাল্য-র ব্যাপারে কি আর বলব, “উফ্‌ফ্‌”!! ছাড়া? 😛

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s