মৎস্যপুরাণ

মাছ প্রসঙ্গে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের সেই গল্পটা সবারই জানা। সেই যে নাসিরুদ্দিন একজন যোগীবাবার কাছে গিয়ে বলেছিলেন যে একটি মাছ একবার তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিল। সেই শুনে যোগীবাবা একইসঙ্গে কৌতূহলী হয়েছিলেন এবং ফ্রাস্ট্রু খেয়েছিলেন। কৌতূহলের কারণটা সহজেই অনুমেয়, আর ফ্রাস্ট্রু খাওয়ার কারণটা হল এই যে আজীবন সাধনা করেও তিনি নাসিরুদ্দিনের ওই লেভেলে উঠতে পারেননি। অনেকবার অনুরোধ-উপরোধ করার পরে অবশেষে মোল্লা রহস্যটা ভেঙেছিলেন এই বলে, “একবার খিদের চোটে প্রচন্ড কাহিল হয়ে পড়েছিলাম, তখন অনেক চেষ্টা করে একটা মাছ ধরে তাকে ভেজে খাই। তাতেই আমার প্রাণরক্ষা হয়”। যোগীবাবার রি-অ্যাকশনটা পাওয়া যায়নি, তবে খুব যে ভাল কিছু হবেনা, সেটা বলাই বাহুল্য।

ভাতমাছপ্রিয় বাঙালির প্রিয় স্লোগান ‘মৎস্য ধরিব খাইব সুখে’। এখন অবশ্য এই জেটগতির কর্পোরেট যুগে মাছ ধরার মতন সময় কারোর হাতেই নেই, তাই পুরনো স্লোগানটা বদলে গিয়ে ‘মৎস্য কিনিব খাইব সুখে’-তে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে খাওয়ার সুখ যে মাছেই, সেই ব্যাপারটা কিন্তু বদলায়নি। একটা বেশ বড় ত্রিভুজাকৃতি রুইমাছের গাদা, তার সঙ্গে একটা প্রমাণ সাইজের আয়তক্ষেত্র পেটি পাতে পড়লে যে স্বর্গীয় অনুভূতিটা হয়, সেটার জন্যেই তো বেঁচে থাকা। কোথায় লাগে এর কাছে পিজ্জা-পাস্তা-লাসাগ্‌না সম ম্লেচ্ছ খাবারদাবার?fish_2

মাছের প্রতি ভালবাসাটা আমি পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। ছোটবেলায় ছুটিছাটার দিনে বাবার সঙ্গে মাছ দেখতে যেতাম। মাছের বাজার মানেই কাদা-প্যাচপ্যাচে একটা ব্যাপার। আমার অবশ্য বেশ লাগতো। সেই কাদার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখতাম মাছওয়ালারা নানা ধরণের মাছ, আর নানা সাইজের আঁশবঁটি নিয়ে বসে খদ্দেরদের ডাকাডাকি করছেন। বড়-ছোট-মাঝারি বিভিন্ন সাইজের মাছ, জ্যান্ত-মড়া-বরফ দেওয়া বিভিন্ন অবস্থায় শোভা পাচ্ছে।

আমার পছন্দ ছিল রুই-কাতলা-মৃগেল জাতীয় বড় মাছ, বড় মাছে কাঁটা কম বলে। কাঁটাওয়ালা মাছ আমার একেবারেই অপছন্দ ছিল।

আমার অবস্থা দেখে বাবা বলতেন, “ওরে বোকা, যে মাছে যত কাঁটা, তার টেস্ট তত বেশি, বুঝলি?” শুধু বলেই ক্ষান্ত হতেন না অবশ্য, হাতেকলমে থিওরীটা প্রমাণ করার জন্য মাঝেমাঝেই প্রচুর কাঁটাওয়ালা মাছ নিয়ে আসতেন বাড়িতে। সেই সুবাদেই আমি খয়রা, খলশে, ফ্যাসা ইত্যাদি মাছ খেয়েছি। তবে কাঁটা ম্যানেজ করতে শিখে বুঝেছিলাম, বাবার থিওরীটা ভুল নয় মোটেই।

মাছ খাওয়ার ব্যাপারে আমি সর্বভুক – স্যামন থেকে শুঁটকি, সব খাই। অনেক মানুষ দেখেছি, যারা মাছের খুব ভক্ত হয়েও শুঁটকিটা এড়িয়ে চলেন, মূলত গন্ধের জন্য। শুনেছি শুঁটকি রান্না করার সময় বিকট গন্ধ বেরোয়, ঘরের লোকজন তো বটেই, পাড়া-প্রতিবেশীরাও নাকি বুঝতে পারেন যে আশেপাশে বৈপ্লবিক কিছু একটা রান্না করা হচ্ছে। ‘শুনেছি’ বলছি এইজন্য যে আমাদের বাড়িতে ওই গন্ধের কারণেই শুঁটকি রান্না হত না। তাই বলে আমাদের খাওয়া আটকাবে কে? মামাবাড়িতে যখনই রান্না হত, আমাদের ডাক পড়ত, আর নেহাৎই যেতে না পারলে আমার আর বাবার জন্য দুটো টিফিনবাটি চলে আসতো। মামীমা শুঁটকিটা অসাধারণ বানাতেন। ঝালের চোটে ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে যেত, আর চোখেরজলে-নাকেরজলে হয়েও আমি হাপুসহুপুস করে একথালা ভাত সাবড়ে দিতাম। মেজজেঠুর বাড়িতেও শুঁটকি রান্না হত, যেটা আসত আগরতলা থেকে। তার স্বাদ আলাদা, কিন্তু খেতে একইরকম দুর্দান্ত। আসলে শুঁটকির প্রিপারেশনের ভালত্বটা নির্ভর করে রাঁধুনীর ওপর। এর জন্য একটা আলাদা লেভেলের এলেম লাগে, যেটা সবার থাকেনা।

তবে দুঃখের কথা এই যে, দুটো বাড়িতেই এখন শুঁটকি রান্না বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে আমারও শুঁটকি খাওয়া গিয়েছে বন্ধ হয়ে।

বয়েসের সাথে সাথে আমার পছন্দের রেঞ্জটাও বাড়তে শুরু করেছিল। ছোট এবং মাঝারি মাছ যে রুই-কাতলাকে সমানে সমানে টেক্কা দিতে পারে, এমনকি তেমন আর্টিস্টের হাতে পড়লে স্বাদের ব্যাপারে ছাড়িয়েও যেতে পারে, সেটা বুঝতে শিখেছিলাম।

মৌরলা মাছের ঝাল আর টক – দুটোই খুব স্বাদু জিনিস, ভাজার কথা আর নাই বা বললাম! আমার কাকীমা কাচকি মাছের একটা শুকনো-শুকনো প্রিপারেশান বানান। কাকুর বাড়িতে বেড়াতে গেলে এই জিনিসটা যেদিন মেনুতে থাকে, সেদিন আমার অন্যকিছু না হলেও চলে, অদ্ভুত ভাল খেতে পদটা।

মাঝারি নয়, তবে ছোটর থেকে একটু বড়, সেরকম কয়েকটা মাছের স্বাদও অসাধারণ। আমোদি মাছ যেমন – কড়া করে ভেজে ডাল দিয়ে খেতে ব্যাপক লাগে। কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়ে পাতলা করে বানানো কাজলী মাছের ঝোল, যেরকম উপাদেয়, সেরকমই স্বাস্থ্যকর।

মাঝারি মাছের ভ্যারাইটি প্রচুর। পার্শে, পাবদা, ট্যাংরা, তেলাপিয়া, বাটা, বেলে, রূপচাঁদা, কৈ – নাম বলে শেষ করা যাবেনা। এইসব মাছ হাল্কা ঝোলের চেয়ে শর্ষেবাটা কিংবা পেঁয়াজ দিয়ে জমে ভাল। তবে এদের মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয় হল ট্যাংরা, পার্শে আর পাবদা। এই তিনটে মাছ মাঝারি এবং বড়, দুই সাইজেই পাওয়া যায়, এবং বানানোর রকমফেরে স্বাদও বদলে বদলে যায়।

ট্যাংরার কথাই ধরা যাক। ডিমভরা বড় সাইজের ট্যাংরা শীতকালে পেঁয়াজকলি দিয়ে বানালে ফাটাফাটি লাগে। যাঁরা স্বাস্থ্য বজায় রাখতে চান, তাঁরা বেগুন দিয়ে পাতলা ঝোল বানিয়ে খেতে পারেন, খারাপ লাগবে না।

fish_3

পাবদার ওপর আমার একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে। পাবদারও নানারকম প্রিপারেশান হয়, তবে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়ে বানানো বড় সাইজের পাবদার ঝোলটা। থালা জুড়ে শুয়ে থাকা একটা পাবদা দেখে মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয় আমার।

শীতকালে আমার আর একটি প্রিয় পদ হল আলু-ফুলকপি দিয়ে বানানো তেলাপিয়া কিংবা কৈ মাছের ঝোল, আর নামানোর আগে তাতে কিছু ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। কৈ মাছের আর একটা খুব বিখ্যাত প্রিপারেশান আছে – তেল কৈ, কিন্তু কেন জানিনা, ওটা আমার ওভারহাইপড্‌ বলে মনে হয়।

এতটা যদি কেউ পড়ে ফেলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন যে বিদেশে যাওয়ার সময় যখন সবাই আমাকে “ওখানে মাছ পাওয়া যায়না কিন্তু!” বলে ভয় দেখিয়েছিল, তখন আমার মনের অবস্থা কি হয়েছিল! কিন্তু অকুস্থলে পৌঁছে দেখলাম, ব্যাপারটা আদপেই সেরকম নয়। দেশীয় মাছ তো পাওয়া যেতই, সঙ্গে বিভিন্ন রকমের বিজাতীয় সামুদ্রিক মাছও মিলত। দেশীয় মাছের ক্ষেত্রে একটা অসুবিধে অবশ্য ছিল – সেগুলো বেশ পুরনো, আর অতদিন বরফে থাকার ফলে তাদেরকে মার্ডার ওয়েপনও বলা যায়, কিন্তু ওইটুকু অসুবিধের সঙ্গে আমি অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিলাম।

বিজাতীয় মাছগুলো অবশ্য প্রায় সবই নতুন ছিল আমার কাছে। টুনা, স্যামন, সোয়াই, ম্যাকারেল, সার্ডিন, বাসা, কিংফিস – এইসব মাছগুলো হুলিয়ে খেয়েছিলাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল টুনা মাছের তরকারি। টুনা জিনিসটা সাধারণত ক্যানে পাওয়া যেত, ক্যানের ভেতরে জলের মধ্যে ছোট ছোট সেদ্ধ টুনার টুকরো। আমেরিকানরা ওই স্বাদহীন সেদ্ধ জিনিসটাই সোনামুখ করে খেয়ে নিত। কিন্তু আমি ব্যাপারটা নিয়ে একটু পাকামি করতাম। পেঁয়াজ-রসুন-কাঁচালঙ্কা অল্প তেলে খানিক নেড়েচেড়ে, দরকারমতন মশলাপাতি দিয়ে, তার মধ্যে ওই টুনার টুকরোগুলো ফেলে দিতাম, একটা মাখামাখা তরকারি তৈরি হত, আর নামানোর আগে খানিক ধনেপাতা। প্রথম যেদিন পদটা খেয়েছিলাম, একদম ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের রান্না বলে বলছি না, উৎসাহীরা ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

স্যামন মাছও নানারকমভাবে বানিয়ে খেতাম – শর্ষে-স্যামন, বেক্‌ড স্যামন, স্যামনের ঝাল, গ্রিল্‌ড্‌ স্যামন – একেকটা পদের একেক রকম স্বাদ, আর প্রতিটাই ভাল খেতে। এছাড়া ওখানকার পমফ্রেট মাছগুলোও স্পেশাল ছিল। অত বড় পমফ্রেট তার আগে আমি চোখেই দেখিনি, খাওয়া তো দূর অস্ত! থাইল্যান্ড থেকে আসত তারা, আর একেকটার ওজন ছিল প্রায় হাফকেজি ! আমরা ‘রাক্ষুসে পমফ্রেট’ বলতাম। তার স্বাদ ছিল বড় ভাল, এখনও মুখে লেগে আছে।

শেষ করি বাঙালির আরেকটি চিরকালীন ফেবারিট মাছের কথা বলে। সেই মাছকে ভেজে, বেগুন দিয়ে ঝোল করে, শর্ষে দিয়ে ভাপা করে, কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে – যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন, তার রেজাল্ট অনবদ্য ছাড়া আর কিছু হতেই পারেনা। যে তেলে তাকে ভাজা হয়, সেই তেল দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ার মধ্যেও একটা অদ্ভুত রোমান্টিসিজম্‌ আছে।

সাধে কি আর টিউবলাইট কোম্পানীর একটা পুরনো অ্যাডের স্লোগান ছিল –

“বাতির রাজা ফিলিপ্স, আর মাছের রাজা ইলিশ”?

fish_4(ছবি উৎসঃ গুগ্‌ল্‌)

বড়দের গোয়েন্দা

গোয়েন্দা গল্পের প্রতি আমার আকর্ষণটা সেই ছেলেবেলা থেকে। ইস্কুলে পড়াকালীন এক বন্ধুর কাছ থেকে নিয়মিত শ্রীস্বপনকুমারের “বাজপাখি সিরিজ”-এর সাপ্লাই পেতাম, আর সেগুলো গোগ্রাসে গিলতাম। তখন ওই বইগুলো ব্যাপক লাগত। “দুই হাতে উদ্যত রিভলবার, আর অন্য হাতে জ্বলন্ত টর্চ লইয়া দীপক দত্ত শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন” পড়ে যা শিহরন জাগত মনে, তাতে গোয়েন্দামশাইয়ের হাতের গরমিলটা চাপা পড়ে যেত। মাথায় ফেল্ট টুপি, গায়ে ওভারকোট, চোখে কালো চশমা আর পাইপ খাওয়া সেই গোয়েন্দাদের খুব ভক্ত ছিলাম আমি। বাদলা রাতে অপরাধীদের ডেরায় হানা দিয়ে তাদের বিরাট চক্রান্তের জাল ভেদ করে শহরবাসীদের মুখে হাসি ফোটাতেন তারা, আর তাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ হলে আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম।

bk_1

শশধর দত্তের দস্যু মোহনের কার্যকলাপও খুব মন দিয়ে পড়তাম আমি। আমার ঠাকুর্দা ‘মোহন সিরিজ’-এর খুব ভক্ত ছিলেন, আর তাঁর থেকে নিয়ে আমিও প্রায় সবগুলো খন্ড পড়ে নিয়েছিলাম। মোহনের মধ্যে একটা রবিনহুডীয় ব্যাপার ছিল – ধনীদের সম্পদ কেড়ে নিয়ে গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা আমাকে খুব টানত। সেইসঙ্গে বৌ রমা, ছেলে স্বপন আর ড্রাইভার বিলাসকে নিয়ে ওর একটা ছিমছাম সংসারও ছিল। কলকাতা শহরের তদানীন্তন পুলিশ কমিশনার মিস্টার বেকার মোহনের শত্রু তো ছিলেনই, সেইসঙ্গে আমারও শত্রু হয়ে উঠেছিলেন। ‘মোহন সিরিজ’-এর একটা লাইন আমার খুব পছন্দের ছিল – “ কোথা থেকে কি হইয়া গেল বোঝা গেল না, কিন্তু মোহন দুই হাতের বাঁধন ছিন্ন করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল”।bk_2

হেমেন্দ্রকুমার রায়ের একাধিক গোয়েন্দাজুটি ছিল, তাদের মধ্যে কুমার-বিমল আর জয়ন্ত-মানিকের কথা মনে পড়ছে। ওদের নিয়ে লেখা গল্প-উপন্যাস, বিশেষ করে ‘যখের ধন’, ‘আবার যখের ধন’ ছোটবেলায় আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত।

এছাড়া পাঁচকড়ি দে বলে একজন গোয়েন্দাগল্প লিখতেন, কিন্তু সেগুলো ‘বড়দের বই’ বলে আমার হাতের নাগালের বাইরে রাখা হত। তবে তার মধ্যেও আমি পাঁচকড়িবাবুর দু-চারটে বই পড়ে ফেলেছিলাম, নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ-শিহরণ-আনন্দের স্বাদ পাওয়ার জন্য, তবে গল্পগুলো সেরকম ভাল লাগেনি।

কিন্তু বড় হওয়ার পরে বুঝলাম, বাজপাখি, মোহন, পাঁচকড়ি দে – এঁদের লেখা গল্পগুলোকে গোয়েন্দাগল্পের তকমা না দিয়ে বিদেশী সি-গ্রেড গল্পের অক্ষম বঙ্গীয় অনুকরণ বলাই ভাল। আসলে ততদিনে শার্লক হোম্‌স্‌ ধরে ফেলেছি, পোয়ারোর সঙ্গে অল্পবিস্তর আলাপ হয়েছে আর ফেলুদা-ব্যোমকেশকে ভালবেসে ফেলেছি। এছাড়া নীহাররঞ্জন গুপ্ত-র কিরীটিও ছিল। প্রথমদিকে কিরীটিকে ভালই লাগতো, তবে ব্যোমকেশ পড়ার পরে কিরীটির প্রতি আকর্ষণটা অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

গোয়েন্দা গল্পের প্রতি আমার প্রীতি দেখে আমার এক বন্ধু একবার নাক সিঁটকে বলেছিল, “কিসব ছাইপাঁশ পড়িস, গোয়েন্দা গল্প আবার সাহিত্য নাকি? ও তো যে কেউই লিখতে পারে!” বন্ধুর কথাটা, বলাই বাহুল্য, আমার একেবারেই মনঃপূত হয়নি। প্রথমত, যে কেউ গোয়েন্দাগল্প লিখতে পারেনা। নিপুণভাবে রহস্যের জাল বিস্তার করে সুষ্ঠুভাবে সেই জাল গুটিয়ে আনা সবার কম্ম নয়, তার জন্য ক্ষমতা লাগে। দ্বিতীয়ত, রোজকার দৈনন্দিন চর্বিতচর্বণ নিয়ে তিনশো পাতার গপ্প লেখাটাই বরঞ্চ তুলনায় অনেক সহজ বলে আমার মনে হয়। অবশ্য এটা একান্তভাবেই আমার ব্যক্তিগত মতামত, এবং এর সঙ্গে অনেকেই একমত হবেননা জানি।

ইংরেজী সাহিত্যে গোয়েন্দাকাহিনীর বিশাল স্টক, আর প্রবাসে থাকাকালীন সেই বিপুল সম্ভারের সঙ্গে খানিকটা পরিচয় ঘটেছিল। কিসব বাঘা-বাঘা গোয়েন্দা গল্প-লিখিয়ে, আর কত রকমারি তাঁদের প্লট! গোল্ডেন এজ-এর পোয়ারো, মার্পল, হোমস্‌, লর্ড পিটার উইম্‌সি, ইন্সপেক্টর ডার্গলিস, ইন্সপেক্টর ওয়েক্সফোর্ড, ব্রাদার ক্যাডভেল ফিলিপ মার্লো থেকে আরম্ভ করে হাল আমলের ইন্সপেক্টর রিবাস, ইন্সপেক্টর মর্স – কত বাঘা বাঘা গোয়েন্দা ঘর আলো করে রয়েছেন। রহস্যেরও কত রকমফের – মিস্ট্রি, থ্রিলার, মার্ডার মিস্ট্রি, লক্‌ড রুম মার্ডার মিস্ট্রি, পুলিস প্রোসিডিওরাল, কোজি মিস্ট্রি ইত্যাদি প্রভৃতি। পাবলিক লাইব্রেরী থেকে বই আনতাম আমি, আর সেখানে দেখতাম, শুধুমাত্র মিস্ট্রির জন্য আলাদা একটা ঘর বরাদ্দ থাকতো। আমার মতন রহস্যপ্রেমীদের কাছে সে ছিল এক মহাভোজ! ওই মহাসাগর থেকে কয়েক মগই মাত্র খেতে পেরেছিলাম আমি, সব যে ভাল ছিল তাও নয়, কিন্তু অপ্‌শন ছিল প্রচুর।

bk_3

কিন্তু বাংলায় গোয়েন্দার সংখ্যা বড্ড কম। তার চেয়েও বড় কথা, বাংলায় গোয়েন্দাগল্প লেখা হয় মূলত ছোটদের জন্য। পরাশর বর্মা, কল্কে-কাশি, ফেলুদা থেকে ইদানিংকালের অর্জুন (এখন মনে হয় রিটায়ার করেছেন), মিতিনমাসি, দীপকাকু, টুবলু-জগুমামা, প্রোফেসর নাট-বল্টু-চক্র – এরা সবাই ছোটদের জগতে নিজ-নিজ মহিমায় বিরাজ করেন। ছোটদের পূজাবার্ষিকী বইগুলোতে রহস্যকাহিনী একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে।

কিন্তু বড়দের জন্য খুব কম লেখকই গোয়েন্দাগল্প লিখেছেন। যাঁরা লিখেছেন, তাঁরাও স্বাদবদলের জন্যেই কলম ধরেছেন, তাঁদের মুনশিয়ানার ক্ষেত্র আলাদা। শুধুমাত্র গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস লিখে সংসার চালান, এরকম লেখক আছেন কি বাংলা সাহিত্যে? মনে হয় না। বাংলায় মনে হয় রহস্যকাহিনী এখনও কৌলীন্য পায়নি, লেখকদের মনোভাব হয়ত আমার সেই নাক-সিঁটকানো বন্ধুর মতন।

ভাগ্যিস শরদিন্দু ছিলেন! আমার মতন রহস্যপিপাসু পাঠকের জন্য ব্যোমকেশকে সৃষ্টি করেছিলেন। বাংলার শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দার ভোটটা আমি ওকেই দিয়ে থাকি। তবে ব্যোমকেশ ছাড়াও আমার আরো কিছু প্রিয় গোয়েন্দা আছেন। তাদের কথা একটু বলি।

সবার আগে বলতে হয় ব্যারিস্টার পি কে বাসু, বার-অ্যাট-ল এর কথা। নারায়ণ সান্যালের ‘কাঁটা সিরিজ’ আমার খুব প্রিয়। যদিও এই সিরিজের উপন্যাসগুলো সবই বিদেশী কাহিনীর ‘ছায়াবলম্বনে লেখা’(পেরি ম্যাসন আর আগাথা ক্রিস্টি), কিন্তু সান্যালমশাইয়ের কলমের জাদুতে সেগুলো খুবই উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

bk_4

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল নীলাদ্রী সরকারও আমার বেশ পছন্দের। কর্নেলের দুটো প্যারালাল সিরিজ আছে, একটা কিশোরদের জন্য, অন্যটা বড়দের জন্য। কিশোর সিরিজটা আগে পড়েছিলাম, এখন বড়দের সিরিজটা পড়তে গিয়ে দেখছি, তার আয়তন বেশ বিপুল, ষোলো না সতেরোটা খন্ড আছে। আপাতত তিনটে খন্ড পড়া হয়েছে। কয়েকটা উপন্যাস বেশ ভাল লেগেছে, কয়েকটা আবার খুবই দায়সারা করে লেখা, গোঁজামিল দিয়ে রহস্য মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বেশ কিছু সময় আগে অদ্রীশ বর্ধনের লেখা কয়েকটা উপন্যাস পড়েছিলাম। তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা ইন্দ্রনাথ রুদ্র ধুতি-পাঞ্জাবী পড়া, পাইপ এবং সুগন্ধী জর্দাপান খাওয়া একজন শৌখীন গোয়েন্দা। ইন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা গল্পগুলো বেশ ভাল লেগেছিল, একটা অন্যরকম স্বাদ ছিল সেগুলোতে।

মাঝখানে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় শবর দাশগুপ্ত নামে একটা গোয়েন্দা চরিত্র তৈরী করেছিলেন, এবং তাকে নিয়ে দু-তিনটে উপন্যাসও লিখেছিলেন।  গল্পগুলো ‘সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার’, তার ওপর শীর্ষেন্দুর লেখনী – তাই লেখাগুলো আমার বেশ ভাল লেগেছিল।  কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি সিরিজটা বন্ধ করে দিলেন, তাতে বেশ দুঃখই হয়েছিল আমার।

শেষ করার আগে বলি, বড়দের জন্য গোয়েন্দাগল্প আরো লেখা হোক। ইদানীংকালের কোনো লেখকই ব্যাপারটার দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণে অ্যাডাল্ট ক্রাইম ফিকশনের এই দুয়োরাণী দশা কি কোনোদিনই ঘুচবে না?

এই রহস্যের সমাধান কেউ করতে পারবেন কি?

(ছবি উৎসঃ গুগল্‌)