কলকাতার কড়চা – ২

(বিরতির পরে)

কলকাতায় গিয়ে এবার অনেকদিন পরে সিড্‌-এর সঙ্গে দেখা হল – প্রায় বছর পাঁচেক বাদে। সিড্‌ আর আমি স্কুলজীবনের বন্ধু, অবশ্য শুধুমাত্র এইটুকু বললে আমাদের সম্পর্কে কিছুই বলা হবেনা। এটা কেবল ‘টিপ্‌ অফ দ্য আইসবার্গ’। আট বছরের পার্টনারশিপে (সিড্‌ ভর্তি হয়েছিল ক্লাস থ্রী তে) বেঞ্চমেট হিসেবে আমরা যেসব কীর্তিকলাপ ঘটিয়েছিলাম, সেগুলো একেবারে বাঁধিয়ে রাখার মতন ছিল। স্কুলে আমাদের জুড়িকে ‘সিড্‌-অরি’ বলে ডাকা হত, যেটা শুনতে অনেকটা ‘শিব-হরি’-র মতন লাগে। তফাত একটাই, তাঁরা সুর-সম্রাট, আর আমরা অসুর-বিচ্ছু!

দেখা হওয়ার পরে সিড্‌ আমাকে নিয়ে গেল রূপালী বালির চরে। সল্টলেক সিটিসেন্টারের উল্টোদিকের এই জায়গাটা নতুন, আগে কোনোদিন আসিনি। আসলে আমি অনেকদিন পরে এই চত্বরে এলাম। তার প্রধান কারণ হল বাড়ির এত কাছে হওয়া সত্বেও সল্টলেক জায়গাটা আমার ঠিক পোষায় না। তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, ওই “জাস্ট লাইক দ্যাট” টাইপ যাকে বলে।

অনেকদিন বাদে এলে সব জায়গাকেই কিরকম “বদলে গেছে, বদলে গেছে” বলে মনে হয়। এক্ষেত্রেও তাই হল। অনেক দোকানপাট দেখলাম, তার মধ্যে বেশিরভাগই রেস্তোঁরা। এত রেস্তোঁরা আগে এখানে ছিল কি? কে জানে!

তবে রূপালী বালি জায়গাটা বেশ ভাল – পরিবেশ এবং পকেট, দুই দিক দিয়েই। সবথেকে ভাল ওখানকার সিগারেট খাওয়ার ব্যালকনিটা, বেশ ‘ফিল’ এসে যায়। সব ‘ফিল’ শব্দ দিয়ে ফিল-আপ করা যায়না, তাই কারো ইচ্ছে হলে, বা আগ্রহ হলে, পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

রূপালী বালির চরে বসে, স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে অনেক মণিমুক্তো কুড়িয়ে যখন আমরা বেরিয়ে এলাম, তখন মনমেজাজ একদম সিরাজের মতন ফুরফুরে। ফেরার পথে সিড্‌-কে বললাম, “কত রেস্তোঁরা হয়ে গেছে মাইরি এখানে, জায়গাটা তো চেনাই যাচ্ছে না!”

সিড্‌ বলল, “আরে মামা, তুমি তো এসেছিলে সেই প্রস্তরযুগে। আমরা রেগুলার আসি, আমরাই চিনতে পারিনা! তবে একটা ব্যাপার ভুল বললি”।

“কোনটা?”

“ওই যে, রেস্তোঁরা। ওই টার্মটা এখন ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে। এগুলোকে এখনকার ছেলেছোকরারা বলে ‘জয়েন্ট’। আমাদের আমলে জয়েন্ট বলতে আমরা পরীক্ষা বুঝতাম, এখন জয়েন্ট মানে এইসব। রেস্তোঁরা হল গিয়ে তারামার্কা ব্যাপার, এসব ছোটোখাটো ঠেক মানেই জয়েন্ট, বুঝলি?”

না বুঝে আর উপায় কি? ‘আমাদের আমল’-ই বটে! হিসেব করে দেখলাম, প্রায় আঠারো বছর আগে স্কুল ছেড়েছি! এখনকার ছেলেছোকরাদের কাছে আমরা নিজেরাই ব্যাকডেটেড হয়ে যাচ্ছি, তায় আমাদের টার্ম।

যত্তোসব!

জয়েন্টের কথাই যখন উঠলো, তখন আর একটা জয়েন্টের কথা বলি। এটা শরৎ বসু রোড, অর্থাৎ ল্যান্সডাউনে। ল্যান্সডাউন ধরে নাকবরাবর সোজা হেঁটে গেলে প্রায় কালীঘাটের কাছাকাছি এসে এই জায়গাটার দেখা মিলবে। জায়গা না বলে ‘ভুল জায়গা’ বলাই উচিৎ অবশ্য। যাদের সঙ্গে গিয়েছিলাম, তাদের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল পুণ্যভূমি Wichita-র বিমানবন্দরের টার্মিনালে। মাঝে প্রায় দুই বছর কেটে গিয়েছে। তবে সেখানে থাকাকালীন শেষ পাঁচ বছর যে তুমুল মস্তিতে কেটেছিল, তার প্রধান হোতা ছিল এই ঋত্বিক। তাই ও আর ওর বৌয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য মুখিয়েই ছিলাম বলা চলে।

ঠেকটার সন্ধান ঋত্বিকই দিয়েছিল। ফোনে যখন কথা হয়েছিল, ও বলেছিল, “জায়গাটার বিশেষত্ব কি জানেন? এখানে ‘হ্যাপি আওয়ার’ চলে সাতটা অবধি, কাজেই বেশ সস্তা-সুন্দর-মজবুত ব্যাপার”। ‘আপনি’ করে বলাটা অবশ্য ঋত্বিকের বিশেষত্ব, বা বলা চলে, ওর বিভিন্ন বিশেষত্বাবলীর মধ্যে একটা। আবেগের বশে মাঝেমাঝে দু-চারটে গুলটুল ঝাড়ে বটে ছেলেটা, তবে ওর এই কথাটা ঠিক ছিল। ‘ভুল জায়গা’ নাম হলেও জায়গাটা দিব্যি লেগেছে আমার। পরিবেশ, অর্থাৎ কিনা এখনকার ভাষায় যাকে বলে ‘অ্যাম্বিয়েন্স’, সেটা বেশ ভাল, আর সাতটার আগে বেরিয়ে এলে পকেটটাও বেশ সস্তার ওপর দিয়েই যাবে।

এই দুই নতুন জায়গার পাশাপাশি প্রতিবারের মতন এবারেও অভীকের সঙ্গে কফিহাউস গেছি। অভীক আর আমার বন্ধুত্বের দেড়যুগ হয়ে গেল, ভাবা যায়? আমাদের কীর্তিকলাপ নিয়ে একটা বই লেখার সময় এসেছে, ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবনাচিন্তা করতে হবে এবার।

কফিহাউসে যখন প্রথম গিয়েছিলাম, ‘ইনফিউশন’-এর দাম ছিল চার টাকা, আর পেঁয়াজির দাম ছয় টাকা। সে প্রায় পনেরো বছর আগের কথা! এই ক’বছরে সেই কালো কফি দশটাকা আর পেঁয়াজি বাইশটাকা হয়েছে, আর দাম যত বেড়েছে, কফি তত জোলো আর পেঁয়াজি তত স্বাদহীন হয়েছে। কিন্তু কফিহাউসের প্রতি আমার টানটা সেই আগের মতই আছে দেখলাম। কাপে কফি দে-বারিস্তা-কোস্তার আমলে এই ব্যাপারটা ভাল না খারাপ, কে জানে!

তবে এবারে সবচেয়ে দুঃখ পেয়েছি পার্কস্ট্রীটে গিয়ে। আমার কাছে পার্কস্ট্রীট বলতেই প্রথম যে চারটে নাম মনে আসে, সেগুলো হল মিউজিকওয়ার্ল্ড, অলিপাব, অক্সফোর্ড আর পিটারক্যাট। এদের সঙ্গে সম্পর্ক তো আর আজকের নয়, সেই কলেজজীবন থেকে। কলেজে পড়ার সময় ক্লাস কেটে অলিপাবে যেতাম, সেখানে বুড়ো সাধুর সঙ্গে খানিকক্ষণ সময় কাটিয়ে, স্টেক খেয়ে ঢুকতাম অক্সফোর্ডে। বইটই পড়ে, মিউজিকওয়ার্ল্ডে খানিক গানটান শুনে বাড়ি ফিরতাম। সে বড়ই সুখের সময় ছিল!

এবারে গিয়ে দেখি মিউজিকওয়ার্ল্ড হাওয়া হয়ে গেছে। কাগজে আর টিভিতে খবরটা দেখেছিলাম যদিও, কিন্তু মিউজিকওয়ার্ল্ড-বিহীন পার্কস্ট্রীটে আমি এবারই প্রথম গেলাম। মিউজিকওয়ার্ল্ডের জায়গায় একটা কেক-পেস্ট্রির দোকান, যার নাম ‘ও বোঁ প্যাঁ’, দেখে মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল, ভ্যাঁ করে কাঁদার ইচ্ছেও হল। এ তো সেই ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল বিড়াল’-এর চেয়েও বাজে। মিউজিকওয়ার্ল্ডের গায়ে একটা জিলাটোর দোকান ছিল, সেটাও ওই বোঁপ্যাঁর ঠ্যালায় হাওয়া হয়ে গেছে।

দেখেশুনে ব্যাপারটা মোটেও ভাল লাগলো না, মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। ভাবলাম, যাই, একটু অলিপাবে বসি গিয়ে। আমার সঙ্গে গিন্নী ছাড়া আমাদের আরো দুজন বন্ধু ছিল। আমাদের এই ‘ডবল কাপ্ল্‌’ এর জুটিটাও মোক্ষম একেবারে। পুণেতে থাকাকালীন উইকএন্ডগুলো এদের সান্নিধ্যে খুব ভাল কেটেছিল আমাদের।

অলিপাবটাও কিরকম বদলে গেছে! আগে শুধু দোতলাটা এসি ছিল, এবারে দেখলাম একতলাটাও এসি করে দিয়েছে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি, বরং এসি-র খরচা উশুল করবার জন্য খাদ্য এবং পানীয়র দাম বেড়ে গেছে, এবং খাবারের কোয়ালিটি একদম পড়ে গেছে। মরাঠাভূমিতে হালে গরু মারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে, তাই মনে অনেক আশা নিয়ে অলিপাবের স্টেক অর্ডার করেছিলাম। কিন্তু দেখেই পিত্তি চটে গেল। ওরকম ঝোল-ঝোল স্টেক আমি জীবনে দেখিনি। খাওয়াব্র সময় তো আরো সরেস ব্যাপার হল। তিনবার ছুরি বদলেও স্টেক কাটতে না পেরে শেষমেশ হাত লাগাতে হয়েছিল। ওখানকার বেয়ারারাও কেমন বেয়াড়া টাইপের হয়ে গেছে। আগে কত বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করত। এবারে কিছু চাইতেই ভয় লাগছিল – যদি কামড়ে দেয়!

তবে অন্য দুটো নাম কিন্তু একেবারেই আমাকে হতাশ করেনি। পিটারক্যাটের ‘চেলো কাবাব’ আজও অসাধারণ – দর্শনে-গন্ধে-স্বাদে এখনও লা-জবাব। অক্সফোর্ডটাও দুরন্ত করেছে, আকারে-আয়তনে অনেক বড় হয়েছে। একতলা থেকে পছন্দমতো বই বেছে নিয়ে দোতলায় আরামদায়ক সোফায় এলিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়লেও কেউ বিরক্ত করবে না, আর বই পড়তে পড়তে যদি তেষ্টা পায়, তার জন্য দোতলাতেই ‘চায় বার’ আছে, যেখানে চা-কফি-স্ন্যাক্স সবই পাওয়া যায়। সবমিলিয়ে আমার জন্য একদম আদর্শ পরিবেশ যাকে বলে!

বিরতির আগে ট্যাক্সির অনেক গুণগান করেছিলাম। কিন্তু সেদিন অলিপাব থেকে ফেরার পথে ট্যাক্সি ধরতে গিয়ে বেশ নাকাল হতে হয়েছিল। ৪০০ টাকা থেকে আরম্ভ করে নামতে নামতে অবশেষে ‘মিটারের ৩০ টাকা বেশি’ হিসেবে চালকমশাই রাজি হয়েছিলেন। বুঝলাম, দরাদরি ব্যাপারটা আজকাল ফুটের মাল কেনার মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই, ট্যাক্সি চড়তে গেলেও এই আর্টটা আজকাল কাজে লাগছে।

এবারে একটা নতুন জিনিস চড়লাম। হাওড়া অঞ্চলের গলিগালাতে আজকাল সাইকেল রিক্সার পাশাপাশি টোটোর খুব চল হয়েছে। ব্যাটারিচালিত এই গাড়িগুলো আমার বেশ পছন্দ হয়েছে – আওয়াজ কম, দূষণ কম আর সবচেয়ে যেটা বড় ব্যাপার, আগে সাইকেল রিক্সায় যুগলে চড়লে রিক্সাওয়ালাকে দেখে যেরকম কষ্ট লাগতো, মনে হত যে কোনো মুহুর্তে বেচারার প্রাণটা বুঝি বেরিয়ে যাবে, টোটো চড়াকালীন সেরকম কোনো অনুতাপ হয়নি। এটা কি কম বড় পাওনা?

এইসব করেটরে দুই সপ্তাহের ছুটিটা যে কোথা দিয়ে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। ফেরার সময় কলকাতা বিমানবন্দরের ঘ্যামচ্যাক নতুন টার্মিনালে বসে মোমো খেতে খেতে না চাইতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল – অফিস নামক জঙ্গল আর বাঘ-ভাল্লুকের কথা ভেবে।

ছুটিগুলো যে কেন আরো লম্বা হয়না!

(খতম)

পুনশ্চঃ একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আগে বিদ্যাসাগর সেতুর রেলিংটাই শুধু নীল-সাদা ছিল, এবারে দেখলাম বডিটা পুরো সাদা করে দিয়ে তাতে নীল নীল বরফি আঁকা হয়েছে, দেখে রূপমের ‘নীল রঙ ভীষণ প্রিয়’ গানটার কথা মনে পড়ে গেল।

কলকাতার কড়চা-১

ঠিক তিনশো চৌষট্টি দিন পরে কলকাতায় এলাম!

একঘন্টা লেট করে মুম্বই দুরন্ত যখন ঢিমে তেতালায় হাওড়ার ১৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢুকে হাঁফাতে লাগলো, ততক্ষণে ট্রেনের সব যাত্রীরা মোটামুটি ‘বোর’ হয়ে গেছে। নবীনের ‘জোশ’ আর নেই, দুরন্ত যত পুরনো হচ্ছে, তত ঝুলন্ত হচ্ছে। যাত্রীরা ট্রেন থেকে নেমে পড়তে কতটা উন্মুখ, সেটা বোঝা গিয়েছিল যখন সাঁতরাগাছি ছাড়াতেই লোকজন সব সুটকেস-ট্রলিব্যাগ বের করে টানতে টানতে গেটের মুখে গিয়ে হাজির হল। কিন্তু বিধি বাম, কেননা টিকিয়াপাড়ায় ট্রেনটা আবার হ্যাঁচকা মেরে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, সমবেত জনতার সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাসে ট্রেনের বগিটা ভারী হয়ে উঠেছিল। এ যেন সেই চায়ের পেয়ালা পিরিচ থেকে উঠে গিয়েছে, কিন্তু ঠোঁট অবধি পৌঁছতে পারছে না!

যাই হোক, অবশেষে সব ঝামেলাটামেলা কাটিয়ে লটবহর নিয়ে হাওয়া স্টেশনে নেমে পড়লাম। নামতেই একটা পরিচিত গন্ধ নাকে এল, যেটা শব্দে ব্যাখ্যা করা খুব মুশকিল, কিন্তু কলকাতায় এলেই আমি এই গন্ধটা পাই। গন্ধটার মধ্যে একটা ফিলগুড ব্যাপার আছে। যতই কলকাতাকে গালাগালি দিই না কেন, এখনও কলকাতায় এলে মনটা খুব ভাল হয়ে যায়, হাজার হোক নিজের শহর বলে কথা!

তাছাড়া কলকাতা শহরের নিজের একটা আকর্ষণ আছে। আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব, চেনা-আধাচেনা-সিকিচেনা মানুষজনদের যদি ছেড়েও দিই, তবুও কিন্তু শহরটা আমাকে টানতে থাকে। এবারে যেমন, জানুয়ারীর মাঝামাঝি থেকেই মনটা আনচান করে উঠেছিল বইমেলার জন্য। সেটাকে কোনোমতে চাপাচুপি দিয়ে জানুয়ারীটা কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু ফেব্রুয়ারী পড়তেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল – প্রথমে কফিহাউস, আর তারপর পার্ক স্ট্রীটের জন্য। মনে হল যেন কত শতাব্দী আগে আমি এদের শেষবারের মতন দেখেছি, এবং আরো কিছুদিন দেখতে না পেলে আমি নির্ঘাত রাস্তা হারিয়ে ফেলব! তাই তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, ম্লেচ্ছদের সেবা তো অনেক হল, এবারে একটু নিজের সেবা করা যাক। মেরে দিলাম ছুটির দরখাস্ত, আর তিনহপ্তা ঝুলিয়ে রেখে রওনা হওয়ার দুদিন আগে ‘খারুস’ ম্যানেজার দরখাস্তটা মঞ্জুর করেছিল। ভাগ্যিস করেছিল, নইলে কি হত সেটা বলা যায়না।

যাই হোক, হাওড়া স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম মিটার ট্যাক্সি চেপে, কেননা ‘প্রিপেড’ ট্যাক্সির লাইনটা বেশি লম্বা ছিল। খবরের কাগজে প্রায়ই কলকাতার ট্যাক্সিওয়ালাদের নিয়ে ভয়ানক সব খবর বেরোয় – বেশি টাকা চাওয়া, চেয়ে না পেলে যাত্রীকে মাঝরাস্তায় নামিয়ে দেওয়া, মারকুটে হলে মেরে যাত্রীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আমাদের সেরকম কিছু হয়নি, মিটারে যা উঠেছিল (একশো দুই), চালক সোনামুখ করে শুধু সেটুকুই নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। তারপর প্রায় আটদিন কেটে গেছে, কিন্তু দোলের দিন “কুড়ি টাকা এক্সট্রা” ছাড়া বাকি চালকরা বর্ণপরিচয়ের গোপালের মতন আচরণ করেছেন আমার সঙ্গে।

স্পর্শং কাষ্ঠং!

এই আটদিনে কলকাতায় দুটো জিনিস খুব চোখে পড়েছে। প্রথমটা হল মাস্ক। ‘সোয়াইন ফ্লু’ গুজরাট-রাজস্থান-মহারাষ্ট্রের পরে এখানেও ঘাঁটি গেড়েছে, আর অন্যান্য মরশুমী রোগ – ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া – প্রতিরোধের ব্যাপারে প্রশাসন যেরকম হুলিয়ে ছড়ায়, এই ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাই সচেতন কলকাতাবাসীরা এবারে নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। মাস্কটা আমি প্রথম দেখি তপাদার মুখে। তপাদা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের দোকানদার, দুধ আর পাঁউরুটি বেচে। সকালে দুধ আনতে গিয়ে দেখি তপাদা কালো রঙের মাস্ক পড়ে বসে আছে। গিয়ে বললাম, “এটা কি পড়েছ গো?”

তপাদা গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, “এটা প্রিকশন!”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিসের জন্য?”

তপাদা বলল, “শুয়োরের বাচ্চাদের জন্য! জানিস না, এখানে ‘সোয়াইন ফ্লু’ হচ্ছে খুব? ওটা হলে আর দেখতে হবে না, এক ছোবলেই ছবি হয়ে যাব। তাই মুখোশ পড়ে বসে আছি, জার্মফার্ম সব আটকে যাবে, বুঝলি কিনা?”

আরো বিশদে বোঝার জন্য আমি প্রশ্ন করলাম, “কাজ হয় এতে?”

“কি বলছিস! আড়াইশো টাকা দাম নিয়েছে মালটার, কাজ হবে না মানে?”

ঠিকই তো! তবে জিনিসটার দাম পঁচিশটাকা হলে তপাদার এই কনফিডেন্স থাকতো কিনা, সেটা বিতর্কের বিষয়।

তারপর থেকে অনেকের মুখেই এই মাস্ক দেখতে পাচ্ছি, আর তাদের বাহারও বেশ রকমারি। শুধু কালো নয়, হলদে, সবুজ, নীল-সাদা এমনকি পোলকা ডটেড মাস্কও দেখেছি একজনের মুখে। আশা করা যায়, এই মাস্কের সাহায্যে ‘সোয়াইন ফ্লু’ পিছু হঠবে।

সত্যিই, জনগণ সচেতন হলে সরকারের চাপ কতটা কমে যায়!

দ্বিতীয় জিনিসটা হচ্ছে ক্লাবঘরের মাথার ওপরের হোর্ডিংগুলো। আমাদের ক্লাবপ্রীতির কথা সবারই জানা। প্রতিটা পাড়ায় অন্তত দু-তিনখানা ক্লাব না থাকলে সেই পাড়া জাতে উঠতে পারেনা। তাই আমাদের পাড়াতেও চারটে গলির মধ্যে তিনটে ক্লাব আছে, আর দুই পা এগিয়ে গেলে আরো একটা ক্লাব – মানে মোটামুটি পাঁচশো মিটারের মধ্যে চারটে, ভাবা যায়?

হাওড়া স্টেশন থেকে আসার সময়েই দেখেছিলাম, দুই পা দূরের ক্লাবটা, যার নাম ‘বর্ণালী স্পোর্টিং ক্লাব’, সেখানে বিয়েবাড়ির আসর বসেছে। ঝিকিমিকি পোষাক পরা বরকনে, ঝিকিমিকি পোষাক পরা লোকজন, আর ফোরগ্রাউন্ডে ভোজপুরী গান – সে এক অসাধারণ অ্যাম্বিয়েন্স! ভাবলাম, নির্ঘাৎ কোনো খোট্টার বিয়ে হচ্ছে।

আমাকে প্রাদেশিক ভাবলেও আমার কিছু করার নেই, এটা আমাদের বাঙ্গালিদের মজ্জাগত। অবাঙ্গালি মানেই আমাদের কাছে সে হিন্দুস্থানী। এই হিন্দুস্থানীদের আবার দুটো ভাগ – চেহারায় পালিশ থাকলে ‘মেড়ো’ (মাউড়াও বলে থাকেন অনেকে), আর পালিশের অভাব হলেই ‘খোট্টা’। এটা ওই মাছ-ভাত-আড্ডা-রসগোল্লার মতই একেবারে আমাদের মূলে ঢুকে গেছে, কিছু করার নেই।

যাই হোক, বাড়িতে এসে ক্লাবটার কথা ভাবলাম খানিকক্ষণ। এই বর্ণালী ক্লাব শুরুতে ছিল একটা টিনের ছাদ দেওয়া আস্তানা। বাম আমলের শেষের দিকে যখন আমাদের পাড়ায় হুলিয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি বানানো আরম্ভ হয়েছিল, তখন ক্লাবটা একতলা পাকাবাড়িতে রূপান্তরিত হয়। এখন এই বামা আমলে এসে একেবারে দোতলা হাঁকিয়ে ফেলেছে!

আমার মনে কৌতূহল জেগে উঠলো। ‘হারানো সুর’ ছবিতে উত্তমকুমার রমাদিকে বলেছিলেন, “কৌতূহল থাকা ভাল, কিন্তু তার একটা সীমারেখা থাকা দরকার!’ কথাটা খুবই দামী, কিন্তু সেটা মেনে চলাটা খুব একটা সহজ নয়, আর আমার পক্ষে তো নয়ই।

কৌতূহল মেটাতে হাজির হয়েছিলাম হুলোদা’র কাছে। হুলোদা, অর্থাৎ হলধর পাল, অফিসিয়ালি বর্ণালী ক্লাবের সেক্রেটারি, আর আন-অফিসিয়ালি হর্তাকর্তাবিধাতা – ক্লাবেরও, আমাদের পাড়ারও। তবে ছোট থেকে আমাকে দেখছে বলে আমার সঙ্গে হুলোদার ভালই খাতির।

তাই পরদিন বিকেলেই ভাঁড়ের চা আর শিঙ্গাড়া নিয়ে বসে গেলাম হুলোদার সঙ্গে। শুধোলাম, “কি বস্‌, আজকাল ক্লাবঘর বিয়েবাড়ির জন্য ভাড়া দিচ্ছ, তাও আবার খোট্টাদের?”

হুলোদা হাসল, বলল, “কি করব বল? দোতলা তোলার খরচটা তো তুলতে হবে”।

বললাম, “দোতলাটা তুললেই বা কেন হঠাৎ? বেশ তো চলছিল”।

“তা চলছিল, কিন্তু টাকাগুলো তো খরচা করতে হবে!”

কথাটা শুনে পুরো হুব্বা হয়ে গেলাম, তাই দেখে হুলোদা বলল, “কদিন পরে এলি এবার?”

উত্তর শুনে মাথা নাড়িয়ে বলল, “ওইজন্যেই! অবশ্য হোর্ডিংটাও খোলা ছিল কাল, আজ লাগাতে হবে আবার। আরে সব ক্লাবগুলো দুলাখ করে ক্যাশ পেল তো, সমাজসেবা করার জন্য! শালা কাঁহাতক আর লোকের পেছনে সূঁচ ফুটিয়ে রক্ত নেওয়া যায়! তাছাড়া এই তো আমাদের পাড়ার পাবলিক, দু’পা হাঁটতে গেলে চারবার ব্রেক মারে, রোগে-ভোগা মাল সব। এদের থেকে রক্ত নিতেও মায়া হয় মাইরি। তাই একবার রক্ত, দুবার কাগাবগা আঁকা কম্পিটিশন, আর একটা খেপ টুর্ণামেন্টের পরে ডিসিশান নিলাম বাকি টাকাটা নিজেদের ভোগেই লাগাই। তাই আর কি!” বলে একটা দেঁতো হাসি হেসে হুলোদা থামলো।

আমি বললাম, “নিশ্চয়ই ওই টাকায় কুলোয়নি!”

“পাগল না পেটখারাপ? যা বেঁচেছিল, তাই দিয়ে একটা বারান্দাই হয়না, তায় দোতলা! পাড়ার লোকেরা ভালবেসে কিছু কিছু দিল, তাই দিয়ে হয়ে গেল”।

‘ভালবাসা’র নানা রূপ, পাড়ার লোকেদের হুলোদা কোন্‌ রূপটা দেখিয়েছিল, সেটা আর জিজ্ঞেস করলাম না। বললাম, “হোর্ডিং-এর কথা কি বলছিলে?”

“ওটা হচ্ছে রসিদ, ক্লাবকে টাকা দিয়েছে, তার প্রমাণ। কাল সকালে দেখিস, বুঝতে পারবি। এখন কাট্‌”।

পরদিন সকালে ক্লাবের সামনে গিয়ে দেখি, মাথার ওপর বিশাল একটা হোর্ডিং। সেখানে অনেককিছু লেখা, যার মোদ্দা কথা হচ্ছে যে এলাকার এম এল এ-দার বদান্যতায় আর রাজ্যের পরম মমতাময়ীর মায়ায় এই ক্লাবকে দুলাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হল, সমাজসেবার জন্য। হোর্ডিং-এ মমতাময়ী আর এম এল এ-দার হাসিমুখের ছবি। তবে মমতাময়ীর হাসিতে সেই আগের মতন জৌলুস নেই, তুমুল কাজের চাপে বেশ ধ্বসে গেছেন বোঝা যাচ্ছে। গোটা রাজ্য এবং রাজ্যবাসীর চাপ মাথায় নিয়েও যে হাসছেন, সেটাই যথেষ্ট নয় কি?

এরপর পাড়া, পাড়ার বাইরে আর বেপাড়ার সব ক্লাবের মাথাতেই ওরকম হোর্ডিং চোখে পড়েছে, এলাকা বিশেষে এম এল এ-দার ছবিটা শুধু বদলে বদলে গেছে। একটাই ব্যাপার কমন দেখলাম, সব ক্লাবগুলোরই চেহারা ফিরেছে।

জনগণের সেবার পাশাপাশি নিজেদের একটু সেবা করলে ক্ষতি তো কিছু নেই।

(বিরতি)