কলকাতার কড়চা-১

ঠিক তিনশো চৌষট্টি দিন পরে কলকাতায় এলাম!

একঘন্টা লেট করে মুম্বই দুরন্ত যখন ঢিমে তেতালায় হাওড়ার ১৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢুকে হাঁফাতে লাগলো, ততক্ষণে ট্রেনের সব যাত্রীরা মোটামুটি ‘বোর’ হয়ে গেছে। নবীনের ‘জোশ’ আর নেই, দুরন্ত যত পুরনো হচ্ছে, তত ঝুলন্ত হচ্ছে। যাত্রীরা ট্রেন থেকে নেমে পড়তে কতটা উন্মুখ, সেটা বোঝা গিয়েছিল যখন সাঁতরাগাছি ছাড়াতেই লোকজন সব সুটকেস-ট্রলিব্যাগ বের করে টানতে টানতে গেটের মুখে গিয়ে হাজির হল। কিন্তু বিধি বাম, কেননা টিকিয়াপাড়ায় ট্রেনটা আবার হ্যাঁচকা মেরে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, সমবেত জনতার সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাসে ট্রেনের বগিটা ভারী হয়ে উঠেছিল। এ যেন সেই চায়ের পেয়ালা পিরিচ থেকে উঠে গিয়েছে, কিন্তু ঠোঁট অবধি পৌঁছতে পারছে না!

যাই হোক, অবশেষে সব ঝামেলাটামেলা কাটিয়ে লটবহর নিয়ে হাওয়া স্টেশনে নেমে পড়লাম। নামতেই একটা পরিচিত গন্ধ নাকে এল, যেটা শব্দে ব্যাখ্যা করা খুব মুশকিল, কিন্তু কলকাতায় এলেই আমি এই গন্ধটা পাই। গন্ধটার মধ্যে একটা ফিলগুড ব্যাপার আছে। যতই কলকাতাকে গালাগালি দিই না কেন, এখনও কলকাতায় এলে মনটা খুব ভাল হয়ে যায়, হাজার হোক নিজের শহর বলে কথা!

তাছাড়া কলকাতা শহরের নিজের একটা আকর্ষণ আছে। আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব, চেনা-আধাচেনা-সিকিচেনা মানুষজনদের যদি ছেড়েও দিই, তবুও কিন্তু শহরটা আমাকে টানতে থাকে। এবারে যেমন, জানুয়ারীর মাঝামাঝি থেকেই মনটা আনচান করে উঠেছিল বইমেলার জন্য। সেটাকে কোনোমতে চাপাচুপি দিয়ে জানুয়ারীটা কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু ফেব্রুয়ারী পড়তেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল – প্রথমে কফিহাউস, আর তারপর পার্ক স্ট্রীটের জন্য। মনে হল যেন কত শতাব্দী আগে আমি এদের শেষবারের মতন দেখেছি, এবং আরো কিছুদিন দেখতে না পেলে আমি নির্ঘাত রাস্তা হারিয়ে ফেলব! তাই তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, ম্লেচ্ছদের সেবা তো অনেক হল, এবারে একটু নিজের সেবা করা যাক। মেরে দিলাম ছুটির দরখাস্ত, আর তিনহপ্তা ঝুলিয়ে রেখে রওনা হওয়ার দুদিন আগে ‘খারুস’ ম্যানেজার দরখাস্তটা মঞ্জুর করেছিল। ভাগ্যিস করেছিল, নইলে কি হত সেটা বলা যায়না।

যাই হোক, হাওড়া স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম মিটার ট্যাক্সি চেপে, কেননা ‘প্রিপেড’ ট্যাক্সির লাইনটা বেশি লম্বা ছিল। খবরের কাগজে প্রায়ই কলকাতার ট্যাক্সিওয়ালাদের নিয়ে ভয়ানক সব খবর বেরোয় – বেশি টাকা চাওয়া, চেয়ে না পেলে যাত্রীকে মাঝরাস্তায় নামিয়ে দেওয়া, মারকুটে হলে মেরে যাত্রীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আমাদের সেরকম কিছু হয়নি, মিটারে যা উঠেছিল (একশো দুই), চালক সোনামুখ করে শুধু সেটুকুই নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। তারপর প্রায় আটদিন কেটে গেছে, কিন্তু দোলের দিন “কুড়ি টাকা এক্সট্রা” ছাড়া বাকি চালকরা বর্ণপরিচয়ের গোপালের মতন আচরণ করেছেন আমার সঙ্গে।

স্পর্শং কাষ্ঠং!

এই আটদিনে কলকাতায় দুটো জিনিস খুব চোখে পড়েছে। প্রথমটা হল মাস্ক। ‘সোয়াইন ফ্লু’ গুজরাট-রাজস্থান-মহারাষ্ট্রের পরে এখানেও ঘাঁটি গেড়েছে, আর অন্যান্য মরশুমী রোগ – ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া – প্রতিরোধের ব্যাপারে প্রশাসন যেরকম হুলিয়ে ছড়ায়, এই ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাই সচেতন কলকাতাবাসীরা এবারে নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। মাস্কটা আমি প্রথম দেখি তপাদার মুখে। তপাদা আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের দোকানদার, দুধ আর পাঁউরুটি বেচে। সকালে দুধ আনতে গিয়ে দেখি তপাদা কালো রঙের মাস্ক পড়ে বসে আছে। গিয়ে বললাম, “এটা কি পড়েছ গো?”

তপাদা গম্ভীরভাবে উত্তর দিল, “এটা প্রিকশন!”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কিসের জন্য?”

তপাদা বলল, “শুয়োরের বাচ্চাদের জন্য! জানিস না, এখানে ‘সোয়াইন ফ্লু’ হচ্ছে খুব? ওটা হলে আর দেখতে হবে না, এক ছোবলেই ছবি হয়ে যাব। তাই মুখোশ পড়ে বসে আছি, জার্মফার্ম সব আটকে যাবে, বুঝলি কিনা?”

আরো বিশদে বোঝার জন্য আমি প্রশ্ন করলাম, “কাজ হয় এতে?”

“কি বলছিস! আড়াইশো টাকা দাম নিয়েছে মালটার, কাজ হবে না মানে?”

ঠিকই তো! তবে জিনিসটার দাম পঁচিশটাকা হলে তপাদার এই কনফিডেন্স থাকতো কিনা, সেটা বিতর্কের বিষয়।

তারপর থেকে অনেকের মুখেই এই মাস্ক দেখতে পাচ্ছি, আর তাদের বাহারও বেশ রকমারি। শুধু কালো নয়, হলদে, সবুজ, নীল-সাদা এমনকি পোলকা ডটেড মাস্কও দেখেছি একজনের মুখে। আশা করা যায়, এই মাস্কের সাহায্যে ‘সোয়াইন ফ্লু’ পিছু হঠবে।

সত্যিই, জনগণ সচেতন হলে সরকারের চাপ কতটা কমে যায়!

দ্বিতীয় জিনিসটা হচ্ছে ক্লাবঘরের মাথার ওপরের হোর্ডিংগুলো। আমাদের ক্লাবপ্রীতির কথা সবারই জানা। প্রতিটা পাড়ায় অন্তত দু-তিনখানা ক্লাব না থাকলে সেই পাড়া জাতে উঠতে পারেনা। তাই আমাদের পাড়াতেও চারটে গলির মধ্যে তিনটে ক্লাব আছে, আর দুই পা এগিয়ে গেলে আরো একটা ক্লাব – মানে মোটামুটি পাঁচশো মিটারের মধ্যে চারটে, ভাবা যায়?

হাওড়া স্টেশন থেকে আসার সময়েই দেখেছিলাম, দুই পা দূরের ক্লাবটা, যার নাম ‘বর্ণালী স্পোর্টিং ক্লাব’, সেখানে বিয়েবাড়ির আসর বসেছে। ঝিকিমিকি পোষাক পরা বরকনে, ঝিকিমিকি পোষাক পরা লোকজন, আর ফোরগ্রাউন্ডে ভোজপুরী গান – সে এক অসাধারণ অ্যাম্বিয়েন্স! ভাবলাম, নির্ঘাৎ কোনো খোট্টার বিয়ে হচ্ছে।

আমাকে প্রাদেশিক ভাবলেও আমার কিছু করার নেই, এটা আমাদের বাঙ্গালিদের মজ্জাগত। অবাঙ্গালি মানেই আমাদের কাছে সে হিন্দুস্থানী। এই হিন্দুস্থানীদের আবার দুটো ভাগ – চেহারায় পালিশ থাকলে ‘মেড়ো’ (মাউড়াও বলে থাকেন অনেকে), আর পালিশের অভাব হলেই ‘খোট্টা’। এটা ওই মাছ-ভাত-আড্ডা-রসগোল্লার মতই একেবারে আমাদের মূলে ঢুকে গেছে, কিছু করার নেই।

যাই হোক, বাড়িতে এসে ক্লাবটার কথা ভাবলাম খানিকক্ষণ। এই বর্ণালী ক্লাব শুরুতে ছিল একটা টিনের ছাদ দেওয়া আস্তানা। বাম আমলের শেষের দিকে যখন আমাদের পাড়ায় হুলিয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি বানানো আরম্ভ হয়েছিল, তখন ক্লাবটা একতলা পাকাবাড়িতে রূপান্তরিত হয়। এখন এই বামা আমলে এসে একেবারে দোতলা হাঁকিয়ে ফেলেছে!

আমার মনে কৌতূহল জেগে উঠলো। ‘হারানো সুর’ ছবিতে উত্তমকুমার রমাদিকে বলেছিলেন, “কৌতূহল থাকা ভাল, কিন্তু তার একটা সীমারেখা থাকা দরকার!’ কথাটা খুবই দামী, কিন্তু সেটা মেনে চলাটা খুব একটা সহজ নয়, আর আমার পক্ষে তো নয়ই।

কৌতূহল মেটাতে হাজির হয়েছিলাম হুলোদা’র কাছে। হুলোদা, অর্থাৎ হলধর পাল, অফিসিয়ালি বর্ণালী ক্লাবের সেক্রেটারি, আর আন-অফিসিয়ালি হর্তাকর্তাবিধাতা – ক্লাবেরও, আমাদের পাড়ারও। তবে ছোট থেকে আমাকে দেখছে বলে আমার সঙ্গে হুলোদার ভালই খাতির।

তাই পরদিন বিকেলেই ভাঁড়ের চা আর শিঙ্গাড়া নিয়ে বসে গেলাম হুলোদার সঙ্গে। শুধোলাম, “কি বস্‌, আজকাল ক্লাবঘর বিয়েবাড়ির জন্য ভাড়া দিচ্ছ, তাও আবার খোট্টাদের?”

হুলোদা হাসল, বলল, “কি করব বল? দোতলা তোলার খরচটা তো তুলতে হবে”।

বললাম, “দোতলাটা তুললেই বা কেন হঠাৎ? বেশ তো চলছিল”।

“তা চলছিল, কিন্তু টাকাগুলো তো খরচা করতে হবে!”

কথাটা শুনে পুরো হুব্বা হয়ে গেলাম, তাই দেখে হুলোদা বলল, “কদিন পরে এলি এবার?”

উত্তর শুনে মাথা নাড়িয়ে বলল, “ওইজন্যেই! অবশ্য হোর্ডিংটাও খোলা ছিল কাল, আজ লাগাতে হবে আবার। আরে সব ক্লাবগুলো দুলাখ করে ক্যাশ পেল তো, সমাজসেবা করার জন্য! শালা কাঁহাতক আর লোকের পেছনে সূঁচ ফুটিয়ে রক্ত নেওয়া যায়! তাছাড়া এই তো আমাদের পাড়ার পাবলিক, দু’পা হাঁটতে গেলে চারবার ব্রেক মারে, রোগে-ভোগা মাল সব। এদের থেকে রক্ত নিতেও মায়া হয় মাইরি। তাই একবার রক্ত, দুবার কাগাবগা আঁকা কম্পিটিশন, আর একটা খেপ টুর্ণামেন্টের পরে ডিসিশান নিলাম বাকি টাকাটা নিজেদের ভোগেই লাগাই। তাই আর কি!” বলে একটা দেঁতো হাসি হেসে হুলোদা থামলো।

আমি বললাম, “নিশ্চয়ই ওই টাকায় কুলোয়নি!”

“পাগল না পেটখারাপ? যা বেঁচেছিল, তাই দিয়ে একটা বারান্দাই হয়না, তায় দোতলা! পাড়ার লোকেরা ভালবেসে কিছু কিছু দিল, তাই দিয়ে হয়ে গেল”।

‘ভালবাসা’র নানা রূপ, পাড়ার লোকেদের হুলোদা কোন্‌ রূপটা দেখিয়েছিল, সেটা আর জিজ্ঞেস করলাম না। বললাম, “হোর্ডিং-এর কথা কি বলছিলে?”

“ওটা হচ্ছে রসিদ, ক্লাবকে টাকা দিয়েছে, তার প্রমাণ। কাল সকালে দেখিস, বুঝতে পারবি। এখন কাট্‌”।

পরদিন সকালে ক্লাবের সামনে গিয়ে দেখি, মাথার ওপর বিশাল একটা হোর্ডিং। সেখানে অনেককিছু লেখা, যার মোদ্দা কথা হচ্ছে যে এলাকার এম এল এ-দার বদান্যতায় আর রাজ্যের পরম মমতাময়ীর মায়ায় এই ক্লাবকে দুলাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হল, সমাজসেবার জন্য। হোর্ডিং-এ মমতাময়ী আর এম এল এ-দার হাসিমুখের ছবি। তবে মমতাময়ীর হাসিতে সেই আগের মতন জৌলুস নেই, তুমুল কাজের চাপে বেশ ধ্বসে গেছেন বোঝা যাচ্ছে। গোটা রাজ্য এবং রাজ্যবাসীর চাপ মাথায় নিয়েও যে হাসছেন, সেটাই যথেষ্ট নয় কি?

এরপর পাড়া, পাড়ার বাইরে আর বেপাড়ার সব ক্লাবের মাথাতেই ওরকম হোর্ডিং চোখে পড়েছে, এলাকা বিশেষে এম এল এ-দার ছবিটা শুধু বদলে বদলে গেছে। একটাই ব্যাপার কমন দেখলাম, সব ক্লাবগুলোরই চেহারা ফিরেছে।

জনগণের সেবার পাশাপাশি নিজেদের একটু সেবা করলে ক্ষতি তো কিছু নেই।

(বিরতি)

Advertisements

5 thoughts on “কলকাতার কড়চা-১

  1. Anirban Halder মার্চ 14, 2015 / 9:09 পুর্বাহ্ন

    Uff, khasa lekhata! Pore besh haslam. Baba-keo pore shonalam. Ayak-ei reaction holo. But this club dole can’t be supported. She has spent crores on clubs each year for three consecutive years, while she can’t pay DA to govt. employees, CTC employees don’t get salary, recruitment in many essential posts in many places don’t happen for years and govt. can’t pay for many development projects. In fact it borrows money to meet day to day expenses!

    • অরিজিত মার্চ 15, 2015 / 8:46 পুর্বাহ্ন

      লেখাটা ভাল লাগার জন্য অনেক ধন্যবাদ অনির্বাণ। 🙂
      তাঁর কথা আর না বলাই ভাল, আমাদের মতন তুচ্ছ মনুষ্যের পক্ষে তাঁর কাজের বিচার করাটা বাতুলতা মাত্র!

  2. tubaibanerjee এপ্রিল 4, 2015 / 6:38 অপরাহ্ন

    besh laglo. duranta ekhon jhulanta hoye porechche. Samaj sebar sange jadi nijer cluber seba kora jay se to bhalo i.

  3. অরিজিত এপ্রিল 5, 2015 / 10:23 পুর্বাহ্ন

    একদম ঠিক। 🙂
    কমেন্টের জন্যেও অনেক ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s