ঢেঁকুর

“না হে রাজসিংহ, কাজটা তুমি মোটেই ঠিক করোনি”।

“কোন্‌ কাজটা মহারাজ?”

“ওই যে, শুনলাম তুমি ফরমান জারি করেছ, পাশের রাষ্ট্রে নাকি গোরু চালান করা হবে না এবার থেকে! কি দরকার ছিল এসব করার? মানছি ‘আন্ডার দ্য টেবিল”, কিন্তু তবুও, কত আর্থিক ক্ষতি হবে বল দেখি এতে?”

“শুধু আর্থিক ক্ষতিটাই দেখলেন মহারাজ? স্বস্তিটা দেখলেন না?”

“দেখতে পাচ্ছি না তো! দেখাও দেখি”।

“দেখুন মহারাজ, পাশের রাষ্ট্র বিধর্মীদের রাষ্ট্র। ওরা নেমকহারাম! আমাদের খাবে, আমাদের পড়বে, আবার আমাদেরই দাড়ি ওপড়াবে। ওদের সাহায্য করার কোনো মানেই হয়না। তার ওপর আবার ওরা বেজায় রগচটা আর জন্মগত মাথামোটা। তাছাড়া এই গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর যুগে গোমাংস ভক্ষণ না করাই ভাল, ওতে পেট, মাথা – দুটোই গরম হয়। ওদের দেশ তো আর সাইবেরিয়া নয়। মাথামোটাদের মাথা আরো বেশি গরম করিয়ে কি লাভ বলুন? একে-ওকে মারবে, আর তার হ্যাপা সেই আমাদেরকেই সামলাতে হবে”।

“হুম, তোমার কথায় যুক্তি আছে বটে”।

“তাছাড়া আরো একটা কারণ আছে মহারাজ”।

“কি কারণ?”

“আমাদের গোরু, ওরা কেন খাবে? ভাবুন তো, এই যে শয়েশয়ে গোরু এরা আমাদের দেশ থেকে ভাগিয়ে নিয়ে গিয়ে আড়াই প্যাঁচে হালাল করছে, সেগুলো আমাদের দেশে থাকলে কত লিটার দুধ দেবে? সেই দুধ খেয়ে আমাদের দেশের শিশুরা দুধে-ভাতে থাকতে পারবে, আর তাদের বাবামায়েরা আশীর্বাদ, থুড়ি ভোট দিয়ে আমাদের ভরিয়ে দেবে? রইল ‘আন্ডার দ্য টেবিল’ আর্থিক ক্ষতির ব্যাপার, সেটা পরের পাঁচ বছরে অন্যভাবে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। একদম উইন-উইন অবস্থা মহারাজ!”

“বাপরে রাজসিংহ, তোমার বুদ্ধি তো দিনেদিনে বেড়েই চলেছে হে!”

“আজ্ঞে না মহারাজ, এই বুদ্ধি আমার না, গুরুদেবের”।

“তাই বলো, খামোখা তোমায় মইয়ে তুলছিলাম! সত্যিই, গুরুদেব আর গুরুকুল না থাকলে আমাদের যে কি হত!”

“সে তো বটেই!”

“আচ্ছা, মহারাজ্যে যে গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করা হল, তার রেসপন্স তো শুনছি ভালই?”

“সে আর বলতে! ওখানকার সাধারণ মানুষ বেজায় খুশী। কিছু পেছনপাকা আঁতেল আছে, যাদের কোনো কাজ নেই। তারা ওই সারাদিন কিচিরমিচির করে, আটভাট বকে। অবশ্য তাতে লাভের লাভ কিছু হবে না। যত চাপই আসুক, গুরুদেবের হুকুম – আমরা যেন আমাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকি”।

“না না, পাগল নাকি? এই সিদ্ধান্তের কোনো নড়চড় হবে না”।

“তাছাড়া এই তো সবে শুরু। এরপর গোটা দেশে চালু হবে এই আইন, খুব শীঘ্রই”।

“ফাইন ফাইন। বিধর্মীগুলো বড্ড বেড়েছে, সবকটাকে এবার টাইট দেওয়া যাবে। পয়লা এপ্রিল থেকেই সারা দেশে চালু করে দাও এই আইন, ব্যাটারা হেব্বি এপ্রিলফুল হবে!”

“যা বলেছেন মহারাজ। এখন আসি, পুঁথিটুঁথিগুলো একটু ঘাঁটি গিয়ে, কিছু সইসাবুদ করতে হবে”।

“হ্যাঁ হ্যাঁ যাও, কাজে ফাঁকি দিওনা”।

রাজসিংহ চলে গেলে মহারাজ গোটা দেশে গোমাংস নিষিদ্ধ করার আইডিয়াটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। অন্যদের নিয়ে তো সমস্যা নেই – গাঁইগুঁই করবে একটু, তারপর রাজীও হয়ে যাবে। কেবল পূবদিকের একটি রাজ্যকে নিয়েই চিন্তা – ওখানকার লোকগুলো বড্ড ঠ্যাঁটা টাইপের, আর সবথেকে ঠ্যাঁটা হল ওদের রাণীমা!

মহারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

*****

“কি বুঝলেন মিশ্রজী?”

“সত্যানাস হোয়ে গেলো বোনার্জীবাবু, এই বয়েসে এসে এমুন কথা সুনবো ভাবিনি। আমাদের রাণীমার কি মাথা খারাপ হোইয়ে গেলো?”

“কি করে জানবো বলুন? এই বুড়ো বয়েসে শেষে কিনা গোরু খেতে হবে? না খেলে নাকি চাকরি যাবে! এই কথা বৌ শুনলেই তো বাপের বাড়ি চলে যাবে”।

“আরে ব্যানার্জীদা, চাপ নিচ্ছেন কেন? রাণীমা তো বললেন, আস্তে আস্তে সব অভ্যেস হয়ে যাবে। মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই”।

“চুপ কর্‌ তুই! তোর আর কি? তোর তো পোয়াবারো, তুই তো এমনিতেই গপাগপ বিফ রোল সাঁটাস”।

“খাবার জিনিস, খাবো না কেন? তাছাড়া খারাপটাই বা দেখছেন কেন? রাণীমা তো এটাও বলেছেন, যে যত বেশি গোমাংস কিনবে, তার ডিএ তত বাড়বে। সেটা কি কম কথা?”

“ছিঃ! ছিঃ! এটা কুনো কথা হল? জীবনে কুনোদিন এসব করিনি, এসব কোথায় পাওয়া যায় তাও জানিনা”।

“আরে মিশ্রজী, ঘাবড়াচ্ছেন কেন? নতুন বাজারে সব পাওয়া যায়। তুরন্ত যাবেন, আর তুরন্ত কিনবেন। বিল নিতে ভুলবেন না কিন্তু, অফিসে জমা দিতে হবে, নইলে ডিএ মিলবে না। খেতে না পারেন চাপ নেই, আমাকে দিয়ে দেবেন। আমার অনেক বেকার বন্ধুবান্ধব আছে, হেব্বি মোচ্ছব হবে”।

“শালা নিত্যানন্দ, তোর খালি ফুর্তি হলেই হল, না? ব্রাহ্মণের ছেলে, দুইকুড়ি বয়েসে এসে শেষে ধর্মভ্রষ্ট হব?”

“আরে বোনার্জীবাবু, রেখে দিন আপনার ধরম। আপনি তো মচ্ছি-মুর্গা খাওয়া বামুন আছেন। আমি তো সুধ্‌ সাকাহারী আছে, আমার কি হোবে? আমার তো জাত যাবে! হায় হায় হায়!”

“ব্যানার্জীদা, মিশ্রজী, একটা কথা আপনাদের বলে রাখি। জাত হারালে জাত পাওয়া যাবে, এই বয়েসে চাকরি হারালে কিন্তু চাকরি পাওয়া যাবে না, তাও আবার সরকারী চাকরি!”

“শালা!”

*****

“গুরুদেব, আপনি আবার কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন? আমাকে ডেকে পাঠালেই পারতেন”।

“সব আলোচনা মাঠে-ময়দানে হয়না রাজন, তাই তোমার মন্ত্রণাকক্ষে এসেছি। আমাদের কিছু পরিকল্পনা আছে, সেই বিষয়েই তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি”।

“ইয়ে মানে, কি পরিকল্পনা?”

“ঘাবড়ে যেওনা রাজন। তোমাকে সিংহাসনে বসানোর পেছনে আমাদের গুরুকুলের অবদান আছে, সেটা নিশ্চয়ই মানো? তোমাকে যে উদ্দেশ্যে সিংহাসনে বসিয়েছি, সেটাও আশা করি ভুলে যাওনি?”

“আজ্ঞে না গুরুদেব। সেই কাজ তো শুরু হয়ে গেছে। সারা দেশে গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ হল বলে!”

“জানি মহারাজ। কিন্তু সেটা তো সূচনা মাত্র। এবারে আমাদের পরিকল্পনাটা আরেকটু ব্যাপকতা লাভ করতে চলেছে”।

“কিরকম?”

“তুমি নিশ্চয়ই জানো, ভগবান শ্রীবিষ্ণুর দশটি অবতারের মধ্যে প্রথম তিনটি হল মৎস্য, কুর্ম এবং বরাহ। যেমনভাবে আমরা গো-মাতার পূজা করে থাকি, আমরা ঠিক করেছি যে এখন থেকে আমরা এই তিনটি প্রাণীকেও অনুরূপভাবে পূজা করবো। খুব স্বাভাবিকভাবেই, পূজনীয়কে ভক্ষণ করা পাপ, ওতে নরকগমন হয়। তাই এখন থেকে মাছ, কচ্ছপ এবং শূকর খাওয়াও নিষিদ্ধ করতে হবে সারা দেশে”।

“ইয়ে, মানে, সেটা কি ঠিক হবে? তাছাড়া এতে করে কি লাভ হবে গুরুদেব?”

“এটাও বুঝতে পারছ না? হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই যেখানে আসল উদ্দেশ্য, সেখানে ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতারদের রক্ষা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য, বলতে পারো এটা একেবারে প্রাথমিক ধাপ। তাই এই আইন যত শীঘ্র পারো, বলবৎ করে দাও”।

“ঠিক আছে গুরুদেব। আমাকে সকলের সঙ্গে আলোচনা করার একটু সময় দিন, বিশেষ করে রাজসিংহের সঙ্গে”।

“নিশ্চয়ই। আমরা কোনোকিছু চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী নই রাজন। নিশ্চিন্তে আলোচনা কর। আমি আবার একপক্ষ কাল পরে আসব। সেদিনই সুখবরটা শুনে যাব”।

গুরুদেব চলে যান। মহারাজ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন।

কি চাপ জীবনে! যতই চেষ্টা করছেন এদের আওতার বাইরে যেতে, ততই যেন জড়িয়ে পড়ছেন এদের চক্রব্যূহে! এর থেকে কি মুক্তি নেই আর?

*****

দিনতিনেক পরের কথা। রাজসভায় মহারাজ আর রাজসিংহ যে যার জায়গায় গালে হাত দিয়ে বসে আছেন, কারো মুখে কথা নেই, আর দুজনেরই কপালে চিন্তার ভাঁজ। গুরুদেবের সঙ্গে মহারাজের যে আলোচনা হয়েছে, সেটা শোনা ইস্তক রাজসিংহ গুম মেরে গেছেন। মাছ তাঁর প্রিয় খাদ্য, মাছ নিষিদ্ধ হয়ে গেলে আর জীবনে থাকবে কি? মহারাজের ওসব পাটবালাই নেই, তিনি শুদ্ধ শাকাহারী।

মহারাজের চিন্তা অন্য। গোমাংস অবধি ব্যাপারটা ঠিক আছে, কিন্তু অন্যগুলো, বিশেষ করে মাছ যদি নিষিদ্ধ করে দিতে হয়, তাহলে অন্য রাজারা তাঁকে ছিঁড়ে খাবে। তখন কি আর গুরুদেব বাঁচাতে আসবেন?

এমন সময় প্রহরী এসে মহারাজের হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দেয়। রাজসিংহ তখনও চিন্তায় মগ্ন, প্রহরীর আগমন এবং প্রস্থান কিছুই টের পাননি। তিনি তখন বাড়ির ফ্রিজে রাখা চিতল মাছের পেটির স্বপ্নে বিভোর। আহা, এই পেটি খাওয়া কিনা শেষে বন্ধ করে দিতে হবে?

“হায় ভগবান!”

চমকে ওঠেন রাজসিংহ। তাকিয়ে দেখেন, মহারাজ কপাল চাপড়াচ্ছেন, মুখটা কেমন ফ্যাকাসে মেরে গেছে।

“কি হয়েছে মহারাজ?”

মহারাজ উত্তর দেননা, কেবল চিঠিটা বাড়িয়ে ধরেন।

মাই ডিয়ার নারু,

আশা করি ভাল আছ।

একটা অনুরোধ আছে তোমার কাছে। বন্ধু বলেই বলছি, আশা করি কিছু মনে করবে না। সামনের মাসেই তো তোমাদের ওখানে যাচ্ছি। এবারে, বুঝলে, কিছু প্রোটিনের ব্যবস্থা রেখো। গতবার তোমাদের ওখানে নিরামিষ খেয়ে আমার ওজন তিন পাউন্ড কমে গিয়েছিল। তাই ডাক্তারের বারণে এখন নিরামিষ আমার সম্পূর্ণ বন্ধ, স্ট্রিক্টলি নন-ভেজ ডায়েটে আছি। সবচেয়ে ভাল হয় যদি বিফের ব্যবস্থা রাখতে পারো। তুমি বন্ধুলোক, জানি তোমাকে বললেই কাজ হবে।

ভাল থেকো।

বামা

চিঠি পড়ে রাজসিংহ ব্যোমকে গেলেন। মহারাজের দিকে ভ্যাবলামুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হবে মহারাজ?”

মহারাজ তখনও মাথায় হাত দিয়ে বসে। বললেন, “জানিনা, কিচ্ছু জানিনা। বামা যবে আসবে, ততদিনে তো সারাদেশে… সর্বনাশ হয়ে যাবে রাজসিংহ, বামা ক্ষেপে গেলে আমাদের সব গ্রান্ট আটকে যাবে। কিছু একটা ভাবো তাড়াতাড়ি”।

“কি ভাববো মহারাজ? যা আইন তৈরী হয়েছে, তাতে তো গোরুর ত্রিসীমানায় ঘেঁষা যাবেনা, গায়ে হাত দেওয়া তো দূরের কথা!”

“হাম্বা”!

“তুমি কি গোরু হয়ে গেলে রাজসিংহ? লাভ নেই, বামা ক্যানিবাল নয়”।

“আজ্ঞে আমি না মহারাজ, রাজসভার বাইরে একটা গোরু ডাকছে”।

হাম্বারব আরো কাছে এগিয়ে আসে। মহারাজ এবং রাজসিংহ অবাক হয়ে দেখেন, একটা হৃষ্টপুষ্ট গোরু মৃদুমন্দ গতিতে রাজসভায় ঢুকে পড়েছে।

“এ তো মেঘ না চাইতেই জল রাজসিংহ। ভগবানই একে পাঠিয়েছেন। একে লুকিয়ে রাখো, ভাল করে খাওয়াদাওয়া করাও, তারপর বামা এলে একে কাজে লাগানো যাবে”।

“কিন্তু মহারাজ…!”

“কোনো প্রশ্ন নয় হে। এখনও আইনটা লাগু হয়নি, তাই আমরা কোনো বেআইনি কাজ করছি না এখানে। মালটাকে কেবল মাসখানেক লুকিয়ে রাখতে হবে। কোথায় রাখবে, সেটা তোমার ব্যাপার। প্রহরী!”

রাজার হাঁক শুনে গোটাতিনেক প্রহরী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছুটে এল, গোরুটাকে ধরবার জন্য। কিন্তু গোরুটার যেন ধরা দেওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই, দিব্যি পাশ কাটিয়ে যেতে থাকে। রাজসভা জুড়ে রাজা, রাজসিংহ আর প্রহরীদের “ধর্‌ ধর্‌ বাঁধ বাঁধ” চিৎকার আর হইচই শুরু হয়ে গেল। এত হট্টগোল গোরুটার ঠিক পছন্দ হল না। আক্রমণই আত্মরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় মনে করে গোরুটা এবার স্টান্স বদলায়। দুই পা পিছিয়ে গিয়ে, শিং বাগিয়ে…ওমা, একি…এ যে আমার দিকে তেড়ে আসছে! দৌড়ে যে পালিয়ে যাব, সেটাও পারছি না দেখছি। শেষে কিনা গোরুর শিঙের গুঁতোয় প্রাণটা হারাবো? ‘আঁ আঁ’ করে চোখটা বন্ধ করে ফেললাম…

চোখ খুলে দেখি কোথায় গোরু, কোথায় রাজসভা? বিছানায় আমি একা, বাইরে ভোরের আলো ফুটছে, কাকপাখি ডাকাডাকি করছে। ব্যাপারটা ভাল করে বুঝে উঠবার আগেই একটা বিশাল ঢেঁকুর উঠে এল।

এঃ, কি বিশ্রী গন্ধওয়ালা ঢেঁকুর!

গতরাতের অলিপাবের বিফস্টেকটা এখনও হজম হয়নি মনে হচ্ছে।

নাঃ, নমো নমো করে গোরু খাওয়াটা ছেড়েই দেব এবারে।

নাকি…?

সন্দেশ বৃত্তান্ত

সামান্য দুই বাক্স সন্দেশ যে দিনটাকে এরকম তেতো করে দেবে কে জানত!

দুই সপ্তাহ তোফা আরামে বাড়িতে কাটিয়ে ফেরার পথে কিছু সন্দেশ নিয়ে এসেছিলাম অফিসের লোকজনেদের জন্য। কলকাতা নিজে গোল্লায় গেলেও, কলকাতার রসগোল্লা কিন্তু এখনও রসে টইটম্বুর, অন্তত অন্য রাজ্যের মানুষদের কাছে। এবারেও আসার সময় আমাদের গ্রুপের অবাঙালি-ব্রিগেড এসে বলেছিল, “দাদা, কলকাতা থেকে অনেক মিঠাই নিয়ে এস”। এই অনুরোধ ভিনরাজ্যে চাকরিরত সব কলকাতাবাসী বাঙালিই পেয়ে থাকে, এটা নতুন কোনো ব্যাপার নয়। নতুন যেটা, সেটা হচ্ছে এই অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে আমার আক্কেল গুড়ুম হওয়ার ঘটনাটা।

মাইরি, যত উদ্ভট জিনিস আমার সঙ্গেই ঘটে!

লম্বা ছুটির পরে এমনিতেই অফিসে জয়েন করতে গেলে মেজাজটা খিঁচড়ে থাকে, তার ওপর সেদিন গেট দিয়ে ঢুকতে যেতেই বাধা পেলাম। দুহাত বাড়িয়ে সিকিউরিটি আমাকে আটকালো, বলল, “বাক্সতে কি আছে?”

আমার উত্তর শুনে মাথা নেড়ে বলল, “এই গেট দিয়ে ঢোকা যাবেনা, ‘ফেজ টু’ দিয়ে যাও”।

এখানে বলে রাখা ভাল, আমাদের অফিসে ঢোকার তিনটে গেট, আর কেত মারার জন্য তাদের ফেজ ওয়ান-টু-থ্রী নামে ডাকা হয়। অফিসকর্মীরা যেকোনো গেট দিয়েই ঢুকতে পারেন, সেটা তাদের নিজেদের চয়েস।

‘ফেজ ওয়ান’-এ বাধা পেয়ে আমি বাক্যব্যয় করলাম না, গুটিগুটি ফেজ-টু তে গিয়ে হাজির হলাম। কিন্তু ওখানেও আমাকে আটকালো, গুঁফো গার্ড বলল, “বাক্স নিয়ে এখান দিয়ে ঢোকা যাবেনা, ফেজ থ্রী দিয়ে যাও!”

মাথাটা হাল্কা গরম হল, বললাম, “আগের গেটে তো বলল এখানে আসতে, এখন তুমি বলছ পরেরটায় যেতে। ব্যাপারটা কি?”

গুঁফো মোলায়েম হেসে বলল, “স্যার, এটাই নিয়ম। বাক্সটাক্স নিয়ে ঢুকতে হলে ফেজ থ্রী দিয়েই যেতে হবে!”

নিয়ম-আওড়ানো গার্ডরা হেব্বি গেঁতো হয়, সেটা আমি আগেও দেখেছি। তাই এর সঙ্গে আর সময় নষ্ট না করে ফেজ থ্রীতে হাজির হলাম। এটাই লাস্ট গেট, এখানেই একটা এস্‌পার-ওস্‌পার হয়ে যাবে।

ফেজ থ্রী দিয়ে আমি সাধারণত ঢুকিনা, কেননা ওখান থেকে আমার বসার জায়গাটা বেশ দূরে। অন্য দুটো গেটের তুলনায় এখানে গার্ডের সংখ্যাও বেশি। সেদিন দেখলাম, তিনজন পুরুষ এবং একজন মহিলা বুঁদির কেল্লা রক্ষা করছেন।

আমার হাতের বাক্সদুটো দেখে স্বভাবতই ‘কি আছে’ জানতে চাওয়া হল। ‘মিঠাই’ শুনে প্রশ্ন এল, “কৌনসা মিঠাই?”

আমি বললাম, “সান্দেস হ্যাঁয়!”

পরের প্রশ্নটা শুনে পিলে চমকে গেল, “কিস্‌কা সান্দেস?”

কি উত্তর দেব ভাবতে গিয়ে ঘেঁটে গেলাম, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “দুকানদার কা সান্দেস”।

গার্ডমশাই কাঁধ ঝাঁকালেন, ওই যাকে চলতি ভাষায় ‘শ্রাগ’ বলে। তারপর আমাকে মহিলাটির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। উনিই মনে হয় এদের কর্ত্রী।

মহিলা প্রথমে বাক্সদুটো ভাল করে দেখলেন। যদিও সেগুলো প্লাস্টিক ব্যাগের মধ্যে ছিল, তবুও তাঁর ‘এক্সপার্ট আই’ প্লাস্টিক ভেদ করে ভেতরের মালপত্র দেখতে পাচ্ছিল বলে আমার মনে হল। মিনিটখানেক পরে বললেন, “কতটা মিঠাই আছে?”

আমি বললাম, “ওই খান পঞ্চাশেক হবে দুটো মিলিয়ে”।

মহিলা তাতে খুশি হলেন না, জিজ্ঞেস করলেন, “ওজন কত?”

পুণেতে দেখেছিলাম, আর এখানেও দেখছি, মিষ্টি সাধারণত ওজনে বিক্রি হয়, আমাদের মতন ‘পিস’ হিসেবে নয়। পঞ্চাশপিস সন্দেশের কতখানি ওজন হতে পারে সেটা নিয়ে একটু ভেবেচিন্তে বললাম, “কত আর, এক-দেড় কিলো হবে, তার বেশি না”।

মহিলা মাথা নাড়িয়ে বললেন, “মেল আছে?”

প্রশ্নটা এমনই বেমক্কা আর অপ্রত্যাশিত যে আমার মুখ দিয়ে “কিসের মেল?” বেরোতে এক সেকেন্ডও লাগলো না।

মহিলা একটু বিরক্তমুখে বললেন, “অ্যাপ্রুভাল মেল!”

আমি যাকে বলে ঘাবড়ে ঘোড়া হয়ে গেলাম! সামান্য মিষ্টি নিয়ে আসতেও অ্যাপ্রুভাল মেল লাগে? এরকম আজব কথা কেউ কোনোদিন শুনেছে, না ভেবেছে? ভ্যাবলামুখে বললাম, “মেল তো নেই। কাকে করতে হয়, সেটাও তো জানিনা”।

মহিলা বললেন, “মেল ছাড়া তো বাক্স নিয়ে ঢোকা বারণ স্যার”।

কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপার! সন্দেশগুলো কি তাহলে বাক্সবন্দী অবস্থাতেই অপঘাতে মরবে, ওদের কি বীরগতিপ্রাপ্তি হবেনা? মাথাটা তখন বেশ গরম হয়ে গেছে, কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে এটাও বুঝলাম, মেজাজ গরম করলে চাপ বাড়বে ছাড়া কমবে না। তাই মুখটা যতটা সম্ভব করুণ করে মহিলাকে বললাম, “তাহলে কি এগুলো ফেলে দেবো? সেই কলকাতা থেকে কত কষ্ট করে নিয়ে এসেছি!”

এই কথা শুনে মহিলা একটু নড়ে বসলেন। তাঁর বাকি সঙ্গীদের সঙ্গে খানিক গুজগুজ করে আলোচনা সেরে নিলেন, তারপর আমাকে বললেন, “এক কাজ করুন, আপনি স্যারের সঙ্গে কথা বলুন। দেখুন উনি কি বলেন”।

অগত্যা! আমি বললাম, “কোথায় পাবো তারে?”

মহিলা পথ বাতলে দিলেন, কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে আমার হাত থেকে বাক্সদুটো নিজের কাছে জমা রাখলেন। করুণ চোখে একবার ওদের দিকে তাকিয়ে আমি ‘স্যারের’ কেবিনের দিকে রওনা দিলাম।

স্যারের নাম মিস্টার ভানুরাজ। কিছু কিছু লোক আছে না, যাদের মুখের দিকে তাকালেই মনে হয় তারা তিলে-ঢ্যামনা, এর মুখটাও ঠিক সেইরকম। গোটা মুখমন্ডল জুড়ে ঢ্যামনাত্ব বিরাজমান, একটা ফ্রেঞ্চকাট সেটাকে আরো খোলতাই করেছে। কেবিনে ঢুকে দেখি লোকটা ফোনে উঁচু গলায় কারো সাথে খেজুর করছে। আমাকে দেখে গলার স্বরটা খানিকটা নামল, তবে খেজুরটা চলতে থাকলো। হতভাগা আমাকে বসতে অবধি বলল না!

প্রায় মিনিটতিনেক বাদে খেজুর শেষ করে, আমার দিকে তাকিয়ে, ভুঁরু কুঁচকে ভানু প্রশ্ন করল, “কি ব্যাপার?”

এক মিনিটে গোটা বিষয়টা বললাম, শুনতে শুনতে ভানু টেবিলে পেনসিল ঠুকতে লাগলো। আমার কথা শেষ হওয়ার পরে বলল, “টিফিন ছাড়া অন্য খাবারের বাক্স নিয়ে ঢুকতে গেলে আমার অ্যাপ্রুভাল লাগে, জানো না?”

‘না’ বলাতে মাথা নেড়ে বলল, “কেন জানো না?”

আমি বললাম, “আমি নতুন, তাছাড়া আমি এরকম পরিস্থিতে আগে কখনো পড়িনি, কাজেই…!”

লোকটা যে ঢ্যামনা, সেটা ওর পরের কথাতেই পরিষ্কার হয়ে গেল। বলল, “এটা কোনো এক্সকিউজ নয়। কোনো ক্রিমিনাল যদি থানায় গিয়ে বলে যে সে নতুন, এটা তার প্রথম অপরাধ, তাহলে কি পুলিশ তাকে ছেড়ে দেবে?”

মাথাটা বিকট গরম হয়ে গেল, অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে বললাম, “সহকর্মীদের জন্য মিষ্টি নিয়ে আসাটা কোনো ক্রাইম বলে তো আমার মনে হয়না”।

এই কথায় হঠাৎ লোকটার কয়েকটা দাঁত দেখা গেল, অবশ্য দেখা দিয়েই তারা উধাও হয়ে গেল। হাসলো, নাকি আমাকে দাঁত খিঁচালো, ঠিক বুঝলাম না।

দুজনে দুজনের দিকে ঘুঘুর মতন তাকিয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। তারপর চটকা ভেঙ্গে ভানু বলে উঠলো, “বেশ। মিষ্টি অ্যালাও করব তোমাকে, তবে এখন নয়, লাঞ্চটাইমে। দিস ইজ নট আ টাইম টু এন্‌জয় সুইটস্‌! তুমি আমাকে একটা মেইল কর, আমি সেটা অ্যাপ্রুভ করব, সেই কপি নিয়ে এসে তুমি দুটোর সময় তোমার বাক্স নিয়ে যেও!”

শালা খচ্চর দি গ্রেট! আমরা কখন মিষ্টি এন্‌জয় করব না করব, সেটাও ব্যাটা ঠিক করে দেবে? নিয়মেরও কি বলিহারি – মেইল, অ্যাপ্রুভাল মেইল, তার কপি, যত্তোসব! দেখেশুনে মনে হল, মিষ্টি নয়, আমি যেন মারণাস্ত্র নিয়ে ঢুকতে চাইছি, আর এটা যেন পাতি অফিস নয়, সাক্ষাত সিবিআই বা ‘র’ হেডকোয়ার্টার!

ঠিক যেন বারো হাত কাঁকুরের তেরো হাত বিচি।

“ওকে” বলে বেরিয়ে এলাম, ধন্যবাদ দিতে আর ইচ্ছে করলো না।

পরের কার্যকলাপ রুটিনমাফিক ছিল – ঠিক দুটো দশে উদ্ধার হয়েছিল আমার সন্দেশের বাক্সদ্বয়, আর সহকর্মী বন্ধুদের সাহায্যে কুড়ি মিনিটের মধ্যে দুটোই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ভানু যদিও বলেছিল ক্যান্টিনে গিয়ে মিষ্টি খেতে, আমরা সিটে বসেই খেয়েছিলাম।

সব নিয়ম কি আর মানা যায়?