সন্দেশ বৃত্তান্ত

সামান্য দুই বাক্স সন্দেশ যে দিনটাকে এরকম তেতো করে দেবে কে জানত!

দুই সপ্তাহ তোফা আরামে বাড়িতে কাটিয়ে ফেরার পথে কিছু সন্দেশ নিয়ে এসেছিলাম অফিসের লোকজনেদের জন্য। কলকাতা নিজে গোল্লায় গেলেও, কলকাতার রসগোল্লা কিন্তু এখনও রসে টইটম্বুর, অন্তত অন্য রাজ্যের মানুষদের কাছে। এবারেও আসার সময় আমাদের গ্রুপের অবাঙালি-ব্রিগেড এসে বলেছিল, “দাদা, কলকাতা থেকে অনেক মিঠাই নিয়ে এস”। এই অনুরোধ ভিনরাজ্যে চাকরিরত সব কলকাতাবাসী বাঙালিই পেয়ে থাকে, এটা নতুন কোনো ব্যাপার নয়। নতুন যেটা, সেটা হচ্ছে এই অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে আমার আক্কেল গুড়ুম হওয়ার ঘটনাটা।

মাইরি, যত উদ্ভট জিনিস আমার সঙ্গেই ঘটে!

লম্বা ছুটির পরে এমনিতেই অফিসে জয়েন করতে গেলে মেজাজটা খিঁচড়ে থাকে, তার ওপর সেদিন গেট দিয়ে ঢুকতে যেতেই বাধা পেলাম। দুহাত বাড়িয়ে সিকিউরিটি আমাকে আটকালো, বলল, “বাক্সতে কি আছে?”

আমার উত্তর শুনে মাথা নেড়ে বলল, “এই গেট দিয়ে ঢোকা যাবেনা, ‘ফেজ টু’ দিয়ে যাও”।

এখানে বলে রাখা ভাল, আমাদের অফিসে ঢোকার তিনটে গেট, আর কেত মারার জন্য তাদের ফেজ ওয়ান-টু-থ্রী নামে ডাকা হয়। অফিসকর্মীরা যেকোনো গেট দিয়েই ঢুকতে পারেন, সেটা তাদের নিজেদের চয়েস।

‘ফেজ ওয়ান’-এ বাধা পেয়ে আমি বাক্যব্যয় করলাম না, গুটিগুটি ফেজ-টু তে গিয়ে হাজির হলাম। কিন্তু ওখানেও আমাকে আটকালো, গুঁফো গার্ড বলল, “বাক্স নিয়ে এখান দিয়ে ঢোকা যাবেনা, ফেজ থ্রী দিয়ে যাও!”

মাথাটা হাল্কা গরম হল, বললাম, “আগের গেটে তো বলল এখানে আসতে, এখন তুমি বলছ পরেরটায় যেতে। ব্যাপারটা কি?”

গুঁফো মোলায়েম হেসে বলল, “স্যার, এটাই নিয়ম। বাক্সটাক্স নিয়ে ঢুকতে হলে ফেজ থ্রী দিয়েই যেতে হবে!”

নিয়ম-আওড়ানো গার্ডরা হেব্বি গেঁতো হয়, সেটা আমি আগেও দেখেছি। তাই এর সঙ্গে আর সময় নষ্ট না করে ফেজ থ্রীতে হাজির হলাম। এটাই লাস্ট গেট, এখানেই একটা এস্‌পার-ওস্‌পার হয়ে যাবে।

ফেজ থ্রী দিয়ে আমি সাধারণত ঢুকিনা, কেননা ওখান থেকে আমার বসার জায়গাটা বেশ দূরে। অন্য দুটো গেটের তুলনায় এখানে গার্ডের সংখ্যাও বেশি। সেদিন দেখলাম, তিনজন পুরুষ এবং একজন মহিলা বুঁদির কেল্লা রক্ষা করছেন।

আমার হাতের বাক্সদুটো দেখে স্বভাবতই ‘কি আছে’ জানতে চাওয়া হল। ‘মিঠাই’ শুনে প্রশ্ন এল, “কৌনসা মিঠাই?”

আমি বললাম, “সান্দেস হ্যাঁয়!”

পরের প্রশ্নটা শুনে পিলে চমকে গেল, “কিস্‌কা সান্দেস?”

কি উত্তর দেব ভাবতে গিয়ে ঘেঁটে গেলাম, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “দুকানদার কা সান্দেস”।

গার্ডমশাই কাঁধ ঝাঁকালেন, ওই যাকে চলতি ভাষায় ‘শ্রাগ’ বলে। তারপর আমাকে মহিলাটির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। উনিই মনে হয় এদের কর্ত্রী।

মহিলা প্রথমে বাক্সদুটো ভাল করে দেখলেন। যদিও সেগুলো প্লাস্টিক ব্যাগের মধ্যে ছিল, তবুও তাঁর ‘এক্সপার্ট আই’ প্লাস্টিক ভেদ করে ভেতরের মালপত্র দেখতে পাচ্ছিল বলে আমার মনে হল। মিনিটখানেক পরে বললেন, “কতটা মিঠাই আছে?”

আমি বললাম, “ওই খান পঞ্চাশেক হবে দুটো মিলিয়ে”।

মহিলা তাতে খুশি হলেন না, জিজ্ঞেস করলেন, “ওজন কত?”

পুণেতে দেখেছিলাম, আর এখানেও দেখছি, মিষ্টি সাধারণত ওজনে বিক্রি হয়, আমাদের মতন ‘পিস’ হিসেবে নয়। পঞ্চাশপিস সন্দেশের কতখানি ওজন হতে পারে সেটা নিয়ে একটু ভেবেচিন্তে বললাম, “কত আর, এক-দেড় কিলো হবে, তার বেশি না”।

মহিলা মাথা নাড়িয়ে বললেন, “মেল আছে?”

প্রশ্নটা এমনই বেমক্কা আর অপ্রত্যাশিত যে আমার মুখ দিয়ে “কিসের মেল?” বেরোতে এক সেকেন্ডও লাগলো না।

মহিলা একটু বিরক্তমুখে বললেন, “অ্যাপ্রুভাল মেল!”

আমি যাকে বলে ঘাবড়ে ঘোড়া হয়ে গেলাম! সামান্য মিষ্টি নিয়ে আসতেও অ্যাপ্রুভাল মেল লাগে? এরকম আজব কথা কেউ কোনোদিন শুনেছে, না ভেবেছে? ভ্যাবলামুখে বললাম, “মেল তো নেই। কাকে করতে হয়, সেটাও তো জানিনা”।

মহিলা বললেন, “মেল ছাড়া তো বাক্স নিয়ে ঢোকা বারণ স্যার”।

কেলেঙ্কারিয়াস ব্যাপার! সন্দেশগুলো কি তাহলে বাক্সবন্দী অবস্থাতেই অপঘাতে মরবে, ওদের কি বীরগতিপ্রাপ্তি হবেনা? মাথাটা তখন বেশ গরম হয়ে গেছে, কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে এটাও বুঝলাম, মেজাজ গরম করলে চাপ বাড়বে ছাড়া কমবে না। তাই মুখটা যতটা সম্ভব করুণ করে মহিলাকে বললাম, “তাহলে কি এগুলো ফেলে দেবো? সেই কলকাতা থেকে কত কষ্ট করে নিয়ে এসেছি!”

এই কথা শুনে মহিলা একটু নড়ে বসলেন। তাঁর বাকি সঙ্গীদের সঙ্গে খানিক গুজগুজ করে আলোচনা সেরে নিলেন, তারপর আমাকে বললেন, “এক কাজ করুন, আপনি স্যারের সঙ্গে কথা বলুন। দেখুন উনি কি বলেন”।

অগত্যা! আমি বললাম, “কোথায় পাবো তারে?”

মহিলা পথ বাতলে দিলেন, কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে আমার হাত থেকে বাক্সদুটো নিজের কাছে জমা রাখলেন। করুণ চোখে একবার ওদের দিকে তাকিয়ে আমি ‘স্যারের’ কেবিনের দিকে রওনা দিলাম।

স্যারের নাম মিস্টার ভানুরাজ। কিছু কিছু লোক আছে না, যাদের মুখের দিকে তাকালেই মনে হয় তারা তিলে-ঢ্যামনা, এর মুখটাও ঠিক সেইরকম। গোটা মুখমন্ডল জুড়ে ঢ্যামনাত্ব বিরাজমান, একটা ফ্রেঞ্চকাট সেটাকে আরো খোলতাই করেছে। কেবিনে ঢুকে দেখি লোকটা ফোনে উঁচু গলায় কারো সাথে খেজুর করছে। আমাকে দেখে গলার স্বরটা খানিকটা নামল, তবে খেজুরটা চলতে থাকলো। হতভাগা আমাকে বসতে অবধি বলল না!

প্রায় মিনিটতিনেক বাদে খেজুর শেষ করে, আমার দিকে তাকিয়ে, ভুঁরু কুঁচকে ভানু প্রশ্ন করল, “কি ব্যাপার?”

এক মিনিটে গোটা বিষয়টা বললাম, শুনতে শুনতে ভানু টেবিলে পেনসিল ঠুকতে লাগলো। আমার কথা শেষ হওয়ার পরে বলল, “টিফিন ছাড়া অন্য খাবারের বাক্স নিয়ে ঢুকতে গেলে আমার অ্যাপ্রুভাল লাগে, জানো না?”

‘না’ বলাতে মাথা নেড়ে বলল, “কেন জানো না?”

আমি বললাম, “আমি নতুন, তাছাড়া আমি এরকম পরিস্থিতে আগে কখনো পড়িনি, কাজেই…!”

লোকটা যে ঢ্যামনা, সেটা ওর পরের কথাতেই পরিষ্কার হয়ে গেল। বলল, “এটা কোনো এক্সকিউজ নয়। কোনো ক্রিমিনাল যদি থানায় গিয়ে বলে যে সে নতুন, এটা তার প্রথম অপরাধ, তাহলে কি পুলিশ তাকে ছেড়ে দেবে?”

মাথাটা বিকট গরম হয়ে গেল, অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করে বললাম, “সহকর্মীদের জন্য মিষ্টি নিয়ে আসাটা কোনো ক্রাইম বলে তো আমার মনে হয়না”।

এই কথায় হঠাৎ লোকটার কয়েকটা দাঁত দেখা গেল, অবশ্য দেখা দিয়েই তারা উধাও হয়ে গেল। হাসলো, নাকি আমাকে দাঁত খিঁচালো, ঠিক বুঝলাম না।

দুজনে দুজনের দিকে ঘুঘুর মতন তাকিয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। তারপর চটকা ভেঙ্গে ভানু বলে উঠলো, “বেশ। মিষ্টি অ্যালাও করব তোমাকে, তবে এখন নয়, লাঞ্চটাইমে। দিস ইজ নট আ টাইম টু এন্‌জয় সুইটস্‌! তুমি আমাকে একটা মেইল কর, আমি সেটা অ্যাপ্রুভ করব, সেই কপি নিয়ে এসে তুমি দুটোর সময় তোমার বাক্স নিয়ে যেও!”

শালা খচ্চর দি গ্রেট! আমরা কখন মিষ্টি এন্‌জয় করব না করব, সেটাও ব্যাটা ঠিক করে দেবে? নিয়মেরও কি বলিহারি – মেইল, অ্যাপ্রুভাল মেইল, তার কপি, যত্তোসব! দেখেশুনে মনে হল, মিষ্টি নয়, আমি যেন মারণাস্ত্র নিয়ে ঢুকতে চাইছি, আর এটা যেন পাতি অফিস নয়, সাক্ষাত সিবিআই বা ‘র’ হেডকোয়ার্টার!

ঠিক যেন বারো হাত কাঁকুরের তেরো হাত বিচি।

“ওকে” বলে বেরিয়ে এলাম, ধন্যবাদ দিতে আর ইচ্ছে করলো না।

পরের কার্যকলাপ রুটিনমাফিক ছিল – ঠিক দুটো দশে উদ্ধার হয়েছিল আমার সন্দেশের বাক্সদ্বয়, আর সহকর্মী বন্ধুদের সাহায্যে কুড়ি মিনিটের মধ্যে দুটোই ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ভানু যদিও বলেছিল ক্যান্টিনে গিয়ে মিষ্টি খেতে, আমরা সিটে বসেই খেয়েছিলাম।

সব নিয়ম কি আর মানা যায়?

Advertisements

7 thoughts on “সন্দেশ বৃত্তান্ত

  1. সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এপ্রিল 5, 2015 / 7:09 অপরাহ্ন

    দু খানা ঘটনা মনে পড়ে গেল। একটা আলী সাহেবের লেখা। রোমে কাস্টমস ধরেছিলো রসোগোল্লার টিন। গুরুদেব সপার্সদ রসোগোল্লা সাবড়ে দিয়েছিলেন কয়েক টিন। ওই রোমেই, কাস্টমসের সামনে। দু নম্বরটা নেহাত দিশি, আর আপনার মত আমার আপিসের চক্কর। সঙ্গে ছিলো কড়াইশুঁটির কচুরি, বেশী না, ১১০ টা মত, কিলো পাঁচেক আলুর দম, আর অমৃতকুম্ভ সন্দেস। তার আগের দিন মোহনবাগান ডেম্পোকে হারিয়ে ফেডারেশান কাপ জিতেছে, তারই মচ্ছব হবে অফিসে। রাত জেগে কচুরি গড়ে ভেজেছি আমি আর আমার বৌ। ব্যাটাচ্ছেলে বলে কিনা এসব নিয়ে ঢোকা যাবে না। বললুম ওগো, সেলিব্রেশান আছে, ঢুকতে দাও। বলে কিনা, কিস বাত কি? বন্নু – কাল যে ব্যারেটো ঠেলে গুঁজে ডেম্পোর গোলে একখান….. , কওন ব্যারেটো? তওবা তওবা, এমন মানুষ কলকাতায় হেঁটে চলে বেড়ায়? যে ২০০৮ এ ব্যারেটোর নাম শোনেনি? ওরে, তোর মুন্ডু কেটে আমি গাজী হবো আর তার পরে শহীদ। চেঁচামেচি শুনে সিকিওরিটির বড়কত্তা দৌড়ে এলেন। বন্নু – দেখুন না, বলে কিনা কওন ব্যারেটো। এবারে দেখলুম কাঠে কাঠে পড়েছে। বড়কত্তাও যে পাঁড় মোহন বাগান এবারে বুঝলুম। ঝাড়া ১০ মিনিট চলল। শেষে একবার থেমে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আমিও সুযোগ বুঝে সুড়সুড়……।

    • অরিজিত এপ্রিল 5, 2015 / 9:32 অপরাহ্ন

      অসাধারণ অভিজ্ঞতা সোমনাথবাবু। 😀
      সত্যিই, এদের রকমসকম দেখে হাসবো না কাঁদবো ঠাহর করতে পারিনা।

    • Sidhu Mukujjey এপ্রিল 7, 2015 / 4:35 অপরাহ্ন

      Somnath Babu ..aapnar songe porichay nei kintu hridoy ta jehetu sobuj maroon, tai aapnar experience ta pore anondo pelam 🙂

  2. Sidhu Mukujjey এপ্রিল 7, 2015 / 4:29 অপরাহ্ন

    choto belay porechilam ‘Lichu Chor” aar ei dhere boyeshe ‘sondesh Brittanto’. Darun upobhog korlam tor ei experience ta …La jobab..chaliye jao

    • অরিজিত এপ্রিল 7, 2015 / 9:58 অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ বন্ধু। তবে সন্দেশগুলো যে ঝেড়ে দেয়নি, এটাই রক্ষে!

  3. tubaibanerjee জুলাই 24, 2015 / 3:05 অপরাহ্ন

    office e sandesh niye jaowar janeyo je badutik sandesh lagbe eta ke bhabte pare? tobe sandesh je pore kethe pere chile seta jene bhalo laglo.

    • অরিজিত জুলাই 25, 2015 / 9:33 পুর্বাহ্ন

      যা বলেছিস! এক সময় তো আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম প্রায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s