রাজার বচন

বলি হ্যাঁরে, তোরা ভেবেছিসটা কি? এত অসহিষ্ণু কেন তোরা? রাত জেগে ভাষণ লিখে লিখে আমার পিএ-র আঙ্গুলে যখন কড়া পড়ে গেল, কাঠফাটা রোদে সেসব পাতাজোড়া লেকচার ঝেড়ে ঝেড়ে যখন আমার গলা বসে গেল, আর সেইসব আগুনঝড়ানো বক্তিমের ফলে যখন একে একে রাজ্যে রাজ্যে ভোটের বৈতরণীগুলো পার হয়ে গেলি, তখন মনে ছিল না? তখন তো একেবারে ভগবানের আসনে বসিয়ে দিয়েছিলি আমাকে! কোনোদিন একসঙ্গে এত রাজ্যে রাজত্ব করেছিস এর আগে? ছ’বছর আগে দলটা যখন প্রায় ফসিল হয়ে গিয়েছিল, আরেকটু হলেই নামটা অবধি খুঁজে পাওয়া যেত না, তখন কে দলটাকে ফোরফ্রন্টে আনলো, শুনি? এই শর্মা! ক্যারিসমা দেখেছিস? মাথেরান থেকে ম্যানহাটান, শিবাজী পার্ক থেকে সেন্ট্রাল পার্ক – যখন যেখানে গেছি, লোকে তালি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছে। বক্তৃতা শুনতে এত ভীড় বাবার কালে দেখেছিস কোনোদিন? সাহেব থেকে মোসাহেব, হ্যারি থেকে হরি, সব্বাইকে ফিদা করে দিয়েছি। এর জন্য ক্যালি লাগে রে পাগলা, এমনি এমনি এসব হয়না।

কিন্তু লাস্ট কয়েকমাসে কি দু’একটা জায়গায় দল হেরে গেল, ওমনি গেল-গেল রব তুলে দিলি? যে বয়স্কগুলো বাণপ্রস্থে চলে গিয়েছিল, তারা আবার লাইমলাইটে আসার চেষ্টা করছে গরম-গরম কথা বলে। আমাকে নাকি এই হারের দায় নিতে হবে! শুনলেও হাসি পায়, মরে যাই মাইরি।

আরে বাবা, আমি হলাম পরমহংস, দুধটুকু, মানে জয় নিয়েই আমার কারবার। ওসব হারাহারির দায়ভার নিয়ে হারাকিরি করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। কখনও দেখেছিস ছবি ফ্লপ করলে হিরোরা তার দায় নেয়? আর আমি তো শুধু হিরো না, আমি হলাম গিয়ে সুপারহিরো। সত্তর বছর ধরে চলা পরিবারতন্ত্রকে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথার চুলের মতন স্মৃতিটুকু থাক বানিয়ে দিলাম, তার একটা পুরষ্কার নেই? এমন ডোজ দিলাম যে বিদেশী মায়ের কনফিউসড্‌ ছেলেটা একমাস স্রেফ বেপাত্তা হয়ে রইল। আরেবাবা, নামটা রাহুল হলেই কি আর সবাই ওয়াল হয়? কেউ কেউ বা…ও হয়।

যাক্‌গে, মুখ খারাপ করব না। যা বলছিলাম, দলের বুড়োগুলো ভেবেছিল আমি ক্ষমতায় আসার পরে ওদেরকেও গদিতে বসাব। ভোটের আগে সেরকমই কথা হয়েছিল কিনা। কিন্তু আমাকে তো চেনেনা। আমি বাবা হিন্দুধর্মের ধারক-বাহক, আর আমাদের ধর্মগ্রন্থেই তো বলা আছে, বয়সকালে সন্ন্যাস নিতে হয়। তাই কায়দা করে বুড়োগুলোকে সাইডলাইনে পাঠিয়ে দিলাম। পাগল নাকি? এককালের লৌহপুরুষ, যে কিনা একার হাতে একটা মসজিদ ধবসিয়ে দিয়েছিল, সে কিনা বলে জিন্না ভদ্রলোক? যে জিন্না আর নেহেরু মিলে দুটো দেশের আপামর নেতা আর জনতার পেছনে এতবড় একটা আছোলা বাঁশ দিয়ে গেল, তাকে ভদ্রলোক বলার কোনো মানে হয়? তখনই বুঝেছিলাম, লোহায় এবার জং ধরেছে। তাই ঠিক করলাম, আর নয়। বেড়াল দিয়ে যেমন ধানচাষ হয়না, তেমনি বুড়ো দিয়েও রাজনীতি হয় না।

বন্যেরা বনে সুন্দর, আর বুড়ো নেতারা পলিটব্যুরোতে।

নিজের দলের লোকেরাই যদি এরকম করে, তাহলে কি করে চলবে?

এক ব্যাটা বিহারীবাবু, তাকে প্রচারের দায়িত্ব দিইনি বলে ভোটের সময় থেকেই উল্টোপাল্টা বকে চলেছে। রীল লাইফে লোকটা একটাই বুলি দিয়ে বিখ্যাত হয়েছিল, কিন্তু রিয়েল লাইফে সেটা ফলো করতে কোথায় যে ফাটে, কে জানে। ভাল কাজ করতে না পারিস, খারাপ কাজ করা কেন বাপু? অবশ্য খারাপ কাজ করার ব্যাপারে আমার দলের নেতাদের জুড়ি মেলা ভার। সভায় যাবে, লোকের হাততালি পেয়ে বার খেয়ে ভুলভাল বকবে, মিডিয়া সেটা নিয়ে লেবু চটকাবে, বিরোধীরা সেটা নিয়ে যুধিষ্ঠির সাজবে আর এই গোটা প্রসেসটার দায়ভার নেব আমি?

শালা পাগল না পেটখারাপ?

তাছাড়া কতকিছুর দায় নেব আমি? একশো চল্লিশ কোটি জনতার মধ্যে কে কি করছে, তার সব খোঁজ রাখা সম্ভব নাকি? কে কোথায় গণপিটুনিতে মারা গেল, তার জন্য কি আমি দায়ী? সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সব স্বনামধন্য আঁতেলরা পটাপট পুরষ্কার ফিরিয়ে দিতে আরম্ভ করল, সঙ্গে একশো আটবার ‘মার্তন্ড মার্তন্ড’-এর মতন ‘অসহিষ্ণু অসহিষ্ণু’ জপ করতে শুরু করল। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতন হঠাৎ শিবের সৈনিকরা একে-তাকে কালি মাখাতে আরম্ভ করল। তাতে কালিশিল্পটা জাতে উঠলেও, আমার তো বাম্বু হয়ে গেল। বিরোধী আর মিডিয়া একেবারে হাত না ধুয়ে পেছনে লেগে গেল। বলে কিনা, স্টেটমেন্ট চাই। আরেবাবা, স্টেটমেন্ট কি লক্ষ্মীপুজোর নারকেল নাড়ু নাকি, যে চাইলেই পাওয়া যাবে?

আমি বাপু পার্সেন্টেজ ম্যান। হিসেব করে দেখেছি, যত লোক এই বাওয়ালির সঙ্গে যুক্ত, আর যত লোক অ্যাফেক্টেড, তার পার্সেন্টেজ একেবারেই নগণ্য, তাদের জন্য পাতাজোড়া স্টেটমেন্ট দেওয়ার কোনো মানেই হয়না। তাছাড়া স্টেটমেন্ট যে একেবারেই দিইনি, তা তো নয়, দুদিন বাদে দুটো বাক্য তো বলেছিলাম, এতেই সবার বর্তে যাওয়া উচিৎ।

লোকের চাহিদার আর শেষ নেই দেখছি, এরপর তো বৌ ডালে নুন বেশী দিলে বর আমাকে দায়ী করে স্টেটমেন্ট চাইবে।

যাক্‌গে মরুকগে, তোরা দায়ভার আর সহিষ্ণু-অসহিষ্ণু নিয়ে অ্যানালিসিস কর, আমি কদিন বিলেতের হাওয়া খেয়ে আসি। বিজনেস তো হবেই, সঙ্গে কিঞ্চিৎ বিলাসও হবে। এই সময় বিলেতের আবহাওয়াটাও খাসা থাকে।

হ্যাপি দিওয়ালি।