লক্ষ্মীর প্রবেশ ও প্রস্থান

শনিবারের বারবেলায় ছ’ছটা এসএমএস দেখে একদম যাকে বলে ব্যোমকে বিয়াল্লিশ হয়ে গেলাম!

অথচ দিনটা শুরু হয়েছিল খুবই স্বাভাবিক এবং ঘটনাবিহীনভাবে। সকালে উঠে, চা-জলখাবার-ল্যাদ খেয়ে, বই-কাগজ উল্টেপাল্টে দেখে, ব্যাঙ্কে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। গিন্নীর নির্দেশ ছিল সকাল সকাল ব্যাঙ্কের কাজ সেরে এগারোটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এসে মাংস রান্না করতে হবে। আমার সময়জ্ঞানটা চিরকালই একটু গোলমেলে, তাই বেরোব বলে যখন গতর তুললাম, তখনই ঘড়িতে সোয়া এগারোটা বেজে গেছে। তাতে কি? সেই যে ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’ বলে একটা কথা আছে না? যিনি বলেছিলেন, অজানা সেই ব্যক্তির প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতাকে শতকোটি প্রণাম জানিয়ে গিন্নিকে টা-টা করে রাস্তায় নেমে পড়লাম।

পাওলো কোয়েলহো বলেছেন, “খুব মন দিয়ে কিছু চাওয়া হলে নাকি সারা ব্রহ্মান্ড ষড়যন্ত্র করে চাহ্‌নেওয়ালাকে সেই চাহিতা জিনিসটি পাইয়ে দেয়”। অবশ্য পাওলোবাবু কথাটা অনেক কাব্যিক এবং সুরেলা ভাষায় বলেছেন, আমার মতন অসুরের পাল্লায় পড়ে সেটা এরকম ট্যাঁরাব্যাঁকা হয়ে গেল, সেজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে মূল বক্তব্যটা এরকমই ছিল আর কি।

যাই হোক, এই কথাটা বলার পেছনে যে কারণটা, সেটা হচ্ছে এই যে, আমি যে ব্যাঙ্কের উপভোক্তা, সম্প্রতি তার একটি শাখা অফিস খুলেছে আমার বাড়ি থেকে দশ মিনিট হাঁটাপথে, ‘হুমা সিনেমাহল্‌’-এর গায়ে। আগে ব্যাঙ্কের কাজকর্ম সারতে হলে অফিসপাড়ায় যেতে হত, যেখানে এমনিদিনেই আমার যেতে ইচ্ছে করেনা, আর উইকএন্ডে তো নাম শুনলেই গায়ে জ্বর আসে। তাই মাঝেমাঝেই ভাবতাম যদি বাড়ির কাছে একটা শাখা থাকতো! আমার সেই ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে মাসখানেক আগে।

শাখাটা যদিও খুবই ছোট। ট্রানজাকশন সেকশানে একজন, আর ব্যাঙ্কের অন্যান্য কাজকর্ম দেখার জন্য দুইজন – মোট তিনজন কর্মচারী এখানে আছেন। নিত্যনৈমিত্তিক কাজের জন্য এটাই যথেষ্ট, বাকি কাজকর্মের জন্য নেটব্যাঙ্কিং তো আছেই।

ট্রানজাকশন সেকশানে যিনি বসেন, তাঁর নাম সন্দীপ তুপে। আগে যে বারদুই এখানে এসেছি, প্রতিবারই তিনি আমাকে বলেছেন, “আমাদের নতুন ব্রাঞ্চ, যদি বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়পরিজন কেউ থাকে, তাদের প্লিজ এখানে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য রেফার করবেন”। এছাড়া আরো কিছু মামুলি কথাবার্তা হয়েছে, যার ফলে তুপেজীর সঙ্গে আমার বেশ একটা মুখচেনার-বেশী-বন্ধুত্বের-কম ব্যাপার হয়ে গেছে।

এবারের কাজটা ছিল অতি সামান্য – একটা চেক জমা করার কাজ। সেটা করতে লাগলো পাঁচ মিনিট (যদিও আমি গত দশদিন ধরে আসছি-আসব করছিলাম), তারপর ‘হুমা’ থেকে ‘এয়ারলিফ্‌ট’-এর সাড়ে পাঁচটার শো’র দুটো টিকিট কেটে মনের আনন্দে যখন বাড়ি ঢুকলাম, তখন বারোটা বাজতে পাঁচ।

যাক্‌, মুরগীটা পৌনে একটার মধ্যে রান্না হয়ে যাবে। অফিসে না পারলেও, বাড়িতে অন্তত ডেড্‌লাইনের আগেই কাজ নামিয়ে ফেলতে পারবো। এসব ভেবে মনের আনন্দে একটা সিগারেট ধরালাম। ঠিক তখনই টুং শব্দ করে সেলফোন জানান দিল একটা মেসেজ ঢুকেছে। নিশ্চয়ই কোনো রেস্তোরাঁ কুপনটুপন দিচ্ছে, এই ভেবে মেসেজটা খুলেই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম।

মেসেজটা প্রেরক আমার ব্যাঙ্ক, যার বক্তব্য হল যে জনৈক তুষার নরেশ পাটিল আমার অ্যাকাউন্টে পঞ্চান্ন হাজার টাকা জমা করেছেন।

সিগারেটে প্রথম টানটা সবে দিয়েছিলাম, খুকখুক করে কাশি পেয়ে গেল। গিন্নী রান্নাঘর থেকে কমেন্ট পাস করল, “কতবার বলেছি সিগারেট না খেতে, তা কে শোনে কার কথা?” ওর কথায় আমল না দিয়ে কাশতে কাশতেই ধোঁয়াটা ছাড়লাম, আর ধোঁয়াটা বেরোতে যতটা সময় লাগলো, তার চেয়েও কম সময়ে আরো চারবার টুং টুং শব্দ করে চারটে মেসেজ ঢুকলো। চারটেই এসেছে ব্যাঙ্ক থেকে, আর সবারই বক্তব্য এক, শুধু তুষার নরেশ পাটিলের জায়গায় সাবিনা দুগাল, শুধা প্রসন্ন, রেমন্ড শ্রফ্‌ আর প্রতীক সাওয়ান্ত। এরা চারজনে মিলে আমার অ্যাকাউন্টে সব মিলিয়ে সাড়ে তিনলাখ টাকা জমা করেছেন।

সিগারেটের নামে অনেক লোক অনেক নিন্দেমন্দ করেন, আমার কিন্তু সিগারেটকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে তুলনীয় মনে হয়। সুখে-সুঃখে-আনন্দে-শোকে-আশায়-নিরাশায়-প্রেমে-বিরহে মানুষের সঙ্গ দিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যেরকম জুড়ি নেই, সেরকম সিগারেটও কিন্তু এই সবকটা ইমোশনে আমাদের সঙ্গ দিয়ে থাকে, নেহাৎ কুলীন নয় তাই বেচারা কল্কে পায়না।

এক্ষেত্রেও সিগারেটটা ছিল বলে মাথাটা পুরোপুরি ঘাঁটলো না। পরপর দুটো টান দিয়ে কি করব ভাবছি, এমন সময় ছয় নম্বর মেসেজটা এল, যেখানে দেখলাম ‘ভীরা ট্র্যাভেলস্‌ অ্যান্ড লজিস্টিক্‌স’ আমার অ্যাকাউন্টে দেড়লাখ টাকা জমা করেছে।

যা বুঝলাম, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি সাড়েপাঁচলাখ টাকার মালিক হয়ে গিয়েছি!

প্রথম রিঅ্যাকশন হিসেবে, মনে হেব্বি পুলক জাগলো। আইব্বাপ, সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা! এ দিয়ে তো একটা অটোমেটিক মারুতি সেলেরিও গাড়ি হয়ে যাবে! কানের কাছে নোটের খসখস শব্দ আর কয়েনের ঝনঝনানি শুনতে পেলাম। সোফায় গুছিয়ে বসে সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে মানসচক্ষে এও দেখলাম, ‘কিঁউ চল্‌তি হ্যাঁয় পবন’ শুনতে শুনতে আমি নীল সেলেরিও চালিয়ে মুম্বই-পুণের মাখন হাইওয়ে দিয়ে সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছি।

বিভোর হয়ে সেলেরিও চালাচ্ছিলাম, এমন সময়ে ঠোঁটে ফিল্টারের ছ্যাঁকা খেয়ে এবড়োখেবড়ো লালবাহাদুর শাস্ত্রী মার্গে আছড়ে পড়লাম। মানসচক্ষু উবে গিয়ে জ্ঞানচক্ষু ফুটলো। আজ যেরকম অজানা-অচেনা পাঁচজন আমার অ্যাকাউন্টে বেমক্কা সাড়ে পাঁচলাখ দান করে দিল, সেরকম কাল যদি কোনো হরিদাস পাল গোটা অ্যাকাউন্টটা ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়, তখন কি হবে? তখন তো একুল-ওকুল দুই-ই যাবে, তার সঙ্গে আমাকেও বিলকুল নাঙ্গা ফকির হয়ে অনুকুল ঠাকুরের আশ্রমে চলে যেতে হবে। ব্যাপারটা ভেবেই আমার সর্বাঙ্গে কুলকুল করে ঘাম ফুটে উঠলো।

গিন্নীর সঙ্গে আলোচনা করে দুজনেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে সবার আগে ব্যাঙ্কেই যাওয়া উচিৎ, কেননা গোটা ব্যাপারটা সেখান থেকেই শুরু হয়েছে কিনা!

আবার রাস্তায় নামলাম। চলতে চলতে ভাবলাম, ব্যাঙ্ক যদি এর সমাধান করতে না পারে, যদি পুলিসের কাছে পাঠিয়ে দেয়, তাহলে তো কেলোর কীর্তি হয়ে যাবে। মরাঠি পুলিশ যদি দাঁত কিড়মিড় করে ইকড়ে-তিকড়ে-কুঠে-সাঠি এইসব বলে লাঠি বাগিয়ে তেড়ে এসে আমাকেই জেলে পুরে দেয়, তাহলে তো চিত্তির। নিরপরাধীদের ওপরেই পুলিশের বেশী রাগ কিনা!

যাই হোক, আবার গিয়ে দাঁড়ালাম তুপেজীর সামনে। ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলাম বিষয়টা। গোটা বিষয়টা শোনার পরে তুপেজী এক হাতে তাঁর ফোনের বোতাম আর অন্যহাতে কী-বোর্ড টিপতে লাগলেন। আমি চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার পেছনে যাঁরা লাইন দিয়েছিলেন, তুপেজী তাঁদের সবাইকে দশ মিনিট পরে আসতে বললেন। লোকগুলো আমার দিকে আগুনে দৃষ্টি দিয়ে এদিকসেদিক ছড়িয়ে গেলেন। ওঁদের দোষ নেই, ওঁদের জায়গায় থাকলে আমিও ওরকম দৃষ্টিই দিতাম।

বেশ অনেকক্ষণ বাদে – আমার হিসেবে আধঘন্টা আর ঘড়ির হিসেবে সাড়ে সাত মিনিট – তুপেজী মুখ তুলে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই, দশমিনিটের মধ্যেই আপনার অ্যাকাউন্ট ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আপনি একটু বসুন, আমি ডেকে নেব”।

কি আর করি! বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট টেনে এলাম। সিগারেটের এই আর একটা খুব ভাল গুণ – ছোটবড় ওয়েটিং টাইমগুলো খুব সহজেই কেটে যায়, ওয়েট যে করছি, সেটা বোঝাই যায়না।

ভেতরে এসে বসে সবে হোয়াটস্‌অ্যাপটা অন্‌ করেছি, এমন সময় তুপেজী ডাক দিলেন। এক ঘন্টার মধ্যে তৃতীয়বার গিয়ে দাঁড়ালাম তাঁর সামনে।

আমাকে দেখেই তুপেজী বলে উঠলেন, “স্যার, আপনার অ্যাকাউন্ট ক্লিয়ার হয়ে গেছে। বাড়তি পেমেন্টগুলো সব রিভার্ট করে দিয়েছি। এখন যা আছে, সেগুলো সব আপনারই”।

মনে মনে বললাম, “আমি কেতাত্থ হয়েছি আর কি”। তারপর শুধোলাম, “কিন্তু হয়েছিলটা কি?”

তুপেজী মধুর হেসে বললেন, “ইয়ে মানে, আপনার ঠিক পরেই এক ম্যাডাম এসে পরপর কিছু পেমেন্ট করলেন নিজের অ্যাকাউন্টে… ওনার সব ক্লায়েন্টদের পেমেন্ট আর কি… তো হয়েছিল কি, সেই পয়সাগুলো সব আপনার অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে গিয়েছিল, মানে অ্যাকাউন্ট উইন্ডোটা বদলাতে ভুলে গিয়েছিলাম”।

যাঃ শালা! এ মাল বলে কি? এ তো তুপে নয়, পুরো তোপ মাইরি! কথা শুনে হাসব, না কাঁদব, বুঝে উঠতে পারলাম না। হুব্বা হয়ে তুপের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, এমন সময় তিনি আবার বললেন, “তবে আপনাকে থ্যাঙ্কস দাদা, ভুলটা তো আমারই। আপনি ছুটে না এলে আমাকে প্রচুর ছোটাছুটি করে ব্যাপারটাকে সামাল দিতে হত। ভেরি মেনি থ্যাঙ্কস”।

কি আর বলব? কাষ্ঠহাসি দিয়ে সরে পড়লাম তুপেজীর সামনে থেকে।

বাড়ি এসে নেটব্যাঙ্কিং-এর মাধ্যমে তুপেজীর কথার সত্যতা যাচাই করে নিলাম। আমার অ্যাকাউন্ট আবার তার পূর্বাবস্থা ফিরে পেয়েছে। যেভাবে ছয়জনের টাকা জমা পড়েছিল, ঠিক সেই অর্ডারে সেগুলো রিভার্টেড হয়ে গেছে।

গিন্নীকে গোটা গল্পটা বললাম। সব শুনে ও বলল, “আচ্ছা ধর, তুমি যদি ফিরে না যেতে, তাহলে টাকাগুলোর কি হত?”

এই একই প্রশ্ন আমার মাথাতেও ঘুরছিল। সত্যিই কি আমরা অতগুলো টাকা হজম করে নিতে পারতাম? মনে হয় না। আজ না হলেও, দুদিন বাদ ঠিকই ব্যাপারটা ধরা পড়ে যেত। তুপেজী তো কেস খেতেনই, সঙ্গে সঙ্গে আমিও ফেঁসে যেতাম।

গিন্নী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “জোর বেঁচে গেলে। আমিই মুরগীটা বানিয়ে নিলাম আজ। তবে সামনের দিন কিন্তু…”

আমি হড়বড়িয়ে বলে উঠলাম, “সে আর বলতে? আসলে মা লক্ষ্মী এলেন, আবার চলে গেলেন…এইসবে অনেক ধকল গেল তো, তাই বলছিলাম, এককাপ চা খাওয়াবে?”

“হুঁ”, বলে গিন্নি রান্নাঘরে চলে গেল।

আটআনা সুখ আর আটআনা স্বস্তি মিশিয়ে আমি একটা শ্বাস ছাড়লাম।