প্রণাম তোমায়…

দু’মাসের বেশী হয়ে গেল, ব্লগে একটাও পোষ্ট নেই!

পোষ্ট তো অনেক বড় ব্যাপার হয়ে গেল, নিদেনপক্ষে একটা একশ চল্লিশ চরিত্রের ট্যুইট হলেও বর্তে যায় বেচারা, কিন্তু সেটাও নেই। অবস্থাটা অনেকটা খরা-কবলিত লাতুর কিংবা মারাঠওয়াড়া অঞ্চল, যেখানে একফোঁটা বৃষ্টির আশায় মিলিসেকেন্ড গুনছে সেখানকার মানুষ। কদিন আগে অবশ্য জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর থেকে আশ্বাসবাণী শোনা গিয়েছে – এবারে নাকি একশ ছয় শতাংশ বৃষ্টিপাত হবে। প্রকৃতিও আজকাল পোলারাইজড হয়ে গেছে – হয় অতিবৃষ্টি, আর নইলে অনাবৃষ্টি, আর এই দুটোতেই যেটা কমন ব্যাপার, সেটা হল অনাসৃষ্টি।

কি আর করা! প্রকৃতির পক্ষপাত থেকে চোখটা সরিয়ে ব্লগটার দিকে দৃষ্টিপাত করলাম। হুব্বা হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাবলাম, এই দুই মাসে লিখিনি কেন? ব্যস্ততার দোহাই যে দেবো, তাতে নিজেরই লজ্জা করল। এমন কিছু রাজকার্য আমি করিনি এই দুইমাসে যে লেখার টাইম পাবনা। খানকতক গল্পের বই, ফাঁকিবাজি মেরে অফিস আর অপরিসীম ল্যাদ খাওয়া ছাড়া আর কিছুই করে উঠতে পারিনি এই সময়টায়। তাহলে?

আরো মিনিট আড়াই ভাবার পরে যেটা বুঝতে পারলাম, সেটা হচ্ছে এই যে, আমার অবস্থা হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের নয়নের মতন। হঠাৎ একদিন নানাবিধ ভুলভাল চিন্তাভাবনা আমার মাথার মধ্যে উদয় হয়েছিল, তারপর ঠিক যেমন গরমকালের ঘামাচি বর্ষার আগমনে নিজেনিজেই মিলিয়ে যায়, সেরকমভাবেই এইসব উদ্ভট চিন্তাভাবনাগুলো মগজ থেকে মিলিয়ে গেছে। হ্যারি পটার পৌনে দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ঢুকে পড়ার পরে দেওয়ালটা যেরকম নিরেট হয়ে গিয়েছিল, আমার মাথাটাও সেরকম খাজা কাঁঠালের মতন নিরেটাকার ধারণ করেছে।

নিজের সম্পর্কে আমার মূল্যায়নগুলো প্রায়শই ঠিক হয়। তাই এক্ষেত্রেও ‘বুলস্‌ আই’ হিট করে বেশ একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করলাম। কিন্তু বাধ সাধলো খবরের কাগজে বের হওয়া একটা খবর, যাতে বলা আছে যে মহারাষ্ট্র সরকার নাকি খরাকবলিত এলাকায় নকল বৃষ্টি নামানোর পরিকল্পনা করছেন, যার জন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বৈঠক ইত্যাদি ইত্যাদি।

খবরটা পড়ে আমার মাথার মধ্যেও পোকা নড়ে উঠলো। নকল বৃষ্টি মানে গোদা বাংলায় যাকে বলে জোর-জবরদস্তি বৃষ্টি নামানো। সেই একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমিও জোর-জবরদস্তি ব্লগে একটা লেখা নামাবো, সে সাপ-ব্যাং-সারদা-নারদা-কেষ্ট-বিষ্টু যা-ই হোক্‌ না কেন, আর সেটা আজই।

ব্যস, প্রণাম ঠুকে নেমে পড়লাম সেই কাজে।

যতটা খিল্লি বা তাচ্ছিল্য নিয়ে ‘প্রণাম’ কথাটা বললাম, জিনিসটা কিন্তু মোটেই ততটা হেলাফেলার নয়। বঙ্গজীবনে ভাতডালমাছ কিংবা বিশেষ্য-সর্বনামের মতন প্রণামেরও একটা বড় ভূমিকা আছে। সারা জীবনে কতজনকে যে আমাদের প্রণাম করতে হয়, তার হিসেব নেই, গুনতে বসলে শেষ করা যাবেনা।

এমনিতে প্রণাম করা নিয়ে আমার অসুবিধে নেই। যাঁদের মন থেকে ভালবাসি, শ্রদ্ধাভক্তি করি, সম্মান করি, তাঁদের প্রণাম করতে আমার বরং ভালই লাগে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা প্রণামটা নেননা, বরং বুকে জড়িয়ে ধরে একটা ‘জাদু কি ঝাপ্পি’ দেন, তাতে মনটা একদম ফুরফুরে হয়ে যায়।

কিন্তু গোল বাধে যখন ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অচেনা কোনো মানুষকে, ব্যক্তিটি শুধুমাত্র বয়োঃজ্যেষ্ঠ বলে, তাঁকে প্রণাম ঠুকতে হয়। আমার নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, ছোটবেলা থেকে এমন অনেককে আমি প্রণাম করেছি যাদের আমি সেই একবারই দেখেছি। ব্যাপারটা আরো বেশী করে ঘটে কোনো অনুষ্ঠানবাড়িতে কিংবা গেট টুগেদার-এ।

দৃশ্যটা খুবই চেনা। মা-মাসী-পিসিদের মধ্যে কেউ এসে বলবেন, “শুনছিস, ইনি হলেন…” বলে নানাবিধ সম্পর্কের গলিঘুঁজি পেরিয়ে যেখানে থামবেন, সেখানে আমি পৌঁছতে তো পারবই না, উল্টে আমার মনের মধ্যে জেগে উঠবে সেই অনিবার্য প্রশ্ন – তাহলে ইনি আমার কিনি হলেন? প্রশ্নটা নিয়ে যে একটু ভাবব, তার ফুরসত পাওয়া যাবেনা, কেননা তারপর আমাকে হয় বলা হবে, “এঁকে প্রণাম কর”, নয়তো চোখ দিয়ে ইশারা করা হবে কাজটা করার জন্য।

প্রথমটা হলে ব্যাপারটা অল্পে চুকে যাবে। আমি টপ করে একটা প্রণাম ঠুকে দেব, প্রাপক তাঁর ঝুলি থেকে একটা হাসি দিয়ে বলবেন, “ও মা! কত্ত বড় হয়ে গেছিস! আমাকে মনে আছে? আমি তোকে সেই তোর মুখেভাতের সময় দেখেছিলাম!” জবাবে আমি খানিক ‘হেঁ হেঁ’ করে কেটে পড়ব, বলা হবেনা যে মুখেভাতের সময় দেখলে আমার তাঁকে মনে থাকার কথা নয়।

কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাপারটা আমার পক্ষে খুব চাপ হয়ে যায়, কেননা চোখের ইশারাটিশারা আমি একেবারেই বুঝিনা। ফলে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় খুবই অস্বস্তিকর। একদিকে যিনি পরিচয় করাচ্ছেন, পর্যায়ক্রমে চোখ ঘুরিয়ে আর ভুরু নাচিয়ে তাঁর চোখ আর ভুরু দুটোতেই ব্যথা হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সেটার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে না পেরে আমিও ভুরু তুলে নিঃশব্দে কারণ জানতে চাইছি বা হাঁ করে ইশারাটা বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা করছি। কিন্তু সবচেয়ে বিপদে পড়েন তৃতীয়পক্ষ। হাসিহাসি মুখে একটা প্রণাম নেওয়ার জন্য তিনি মানসিকভাবে তৈরী, পাদুটো খানিক এগিয়েও এনেছেন, এমনকি আশীর্বাদে কি বলবেন সেটাও মনেমনে ছকে ফেলেছেন, কিন্তু আমার মতন গবেটের জন্যেই তিনি তাঁর প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ছোটবেলায় এর জন্য মায়ের কাছে পরে যে কত কানমলা খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই।

বিয়েবাড়ি হলে ব্যাপারটা আরো খোলতাই হয়, যার পুরোভাগে থাকে নববিবাহিত বর-বউ, আর প্রাপকের দলে থাকেন উভয়ের নিকটাত্মীয় এবং, ওই যাকে বলে, এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি। বাঙালিদের ‘এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি’ আক্ষরিক অর্থেই বৃহৎ এবং ব্যাপক। পাড়ার গেজেটেড পিসিমা থেকে পাশের বাড়ির কুচুটে মেজবৌ, পাড়াতুতো পিসেমশাই থেকে ফ্যামিলি ফ্রেন্ড খাসনবিশ কাকু-কাকিমা – সক্কলে এই ট্যাগে বেশ ভালভাবে এসে যান। বিয়ের পরে বরবাবাজি বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলে তারপর থেকেই শুরু হয় এঁদের আনাগোনা। “অ্যাই ভুতো, তোর বউ দেখতে এলাম” বলে তাঁরা নববধূকে ঘিরে ধরেন, আর সদ্য নতুন পরিবেশে আসা মেয়েটি মুখে প্লাস্টিক হাসি লাগিয়ে প্রণাম করে চলে তাঁদের। বঙ্গ সংসারে নতুন বউ এই পাইকারি রেটে প্রণাম করে কতটা সুনাম কুড়োয় জানিনা, তবে সেটা না করলে যে অশেষ দুর্নামের ভাগীদার হয়, সেটা বলাই বাহুল্য।

এই প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুর করুণ অভিজ্ঞতার কথা একটু বলা যাক। অনেক পুরনোদিনের বন্ধু, তাই ওর বিয়েতে প্রচুর হল্লাহাটি করে বউভাতের পরেরদিনই ফের হানা দিয়েছিলাম, ফুলশয্যা কেমন হল জানার জন্য। গিয়ে দেখি বন্ধু ছাদের এককোণে বসে চুপচাপ সিগারেট টানছে, দৃষ্টি উদাস। জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে ব্যাটা, কাল রাতে বেড়াল মারলি?”

একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধু বলল, “কই আর মারতে পারলাম! গত তিনদিন ধরে প্রায় দুশো লোককে পেন্নাম ঠুকে ঠুকে আমার বৌয়ের মাসাক্কালি কোমরে খিঁচ ধরে গেছে। কাল সব মিটে যাওয়ার পরে ঘরে এসে সেই যে কোমরে আইসপ্যাক ঠেসে ধরেছে, এখনও নামায়নি। শালা, ভাল লাগে বল? কালকের রাতটা কি আর ফিরে আসবে?”

বন্ধুর জন্য সত্যিই খুব কষ্ট হল। ওর বউয়ের জন্যেও! বেচারী এখন প্রণামের প্রণামী সামলাতেই ব্যস্ত।

শেষ করার আগে একটা ঘটনার কথা বলি। এটা অনেক পুরনো, প্রায় বছর পঁচিশ আগের। সচরাচর এতদিন আগেকার ঘটনাবলী আমার মনে থাকেনা, কিন্তু কেন জানিনা এই ঘটনাটা এখনও আমার মনে থেকে গেছে। পরিবারের সকলে মিলে যাওয়া হয়েছিল আমার বড়কাকুর বাড়িতে। বারাকপুর স্টেশন থেকে বাসে করে দেবপুকুর, তারপর সেখান থেকে রিকশা বা পায়ে হেঁটে গনেশপুর গ্রামে কাকুর বাড়ি। এখন যদিও জায়গাটা প্রায় শহর হয়ে গেছে, আর এত কসরত করে যেতেও হয়না, স্টেশন থেকেই অটো পাওয়া যায়, কিন্তু বছর পঁচিশেক আগে জায়গাটা বেশ প্রত্যন্ত গ্রামই ছিল। কারেন্ট থাকার তো প্রশ্নই নেই, বরং কাকুর বাড়ির পাশেই ছিল একটা বাঁশবাগান, আর সন্ধ্যা হলেই সেখান থেকে শেয়ালের ডাক শোনা যেত। কুপি আর হ্যারিকেনের আলোয় বেশ একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি হত, আর বড়জেঠুর কাছে সবাই মিলে ভূতের গল্প – বেশ জমে যেত পুরো ব্যাপারটা।

বড়কাকুর বাড়ি থেকে একটু দূরেই ছিল কানুকাকুর বাড়ি। মূলত বড়কাকুর বন্ধু হলেও, সদাহাস্যময় এই মানুষটির সঙ্গে আমাদের সবারই জানাশোনা ছিল। আমাকে এবং আমার খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাই-বোনেদেরও তিনি খুব ভালবাসতেন, দেখা হলেই পালা করে আমাদের সবাইকে সাইকেলে চড়াতেন।

সেবার কি একটা উপলক্ষ্যে কানুকাকুর বাড়িতে আমাদের সবার নিমন্ত্রণ ছিল। বেশ জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হল। কানুকাকুর মা আমাদের জন্য প্রচুর রান্নাবান্না করেছিলেন। যত্নসহকারে আমাদের সবাইকে খাওয়ালেন – খাবারের স্বাদ ছিল অসাধারণ – এমনকি গরমে আমাদের যাতে কষ্ট না হয়, সেজন্য ঠায় বসে থেকে আমাদের তালপাখা দিয়ে হাওয়াও করলেন। ভদ্রমহিলার বয়েস তখনই প্রায় সত্তরের কাছাকাছি, কিন্তু তাঁর উৎসাহে-উদ্যমে সেটা বোঝাই যেত না।

আমরা যখন বেরোব-বেরোব করছি, জনৈক মুখুজ্যেমশাই এলেন কানুকাকুর বাড়ি। বয়স্ক লোকটির হাবেভাবে বেশ একটা মুরুব্বি-মুরুব্বি ভাব ছিল, হয়তো কোনো মোড়লগোছের হবেন, চোখেমুখেও বেশ একটা ঘোড়েলভাব ছিল। কানুকাকুর মা তাঁকেও প্লেটভর্তি খাবার দিলেন – লুচি, মিষ্টি, পায়েস ইত্যাদি। মুখুজ্যেমশাই অল্প খুঁটে খেলেন, বাকিটা প্রসাদ করে রেখে দিলেন। এরপর দেখি, আমাদের বাড়ির সবাই ঢিপঢিপ করে তাঁকে প্রণাম করলেন। বাড়ির বড়রা কাউকে প্রণাম করলে ছোটদেরও করতে হয়, সেটাই নিয়ম, তাই আমরাও বাদ গেলাম না।

বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আচ্ছা মা, তোমরা সবাই মুখুজ্যেমশাইকে প্রণাম করলে কেন? ওঁকে কি চেনো?”

মা বলেছিলেন, “না, সেদিনই দেখলাম। খারাপ কি, বয়স্ক মানুষ, প্রণাম তো করাই যায়। তবে ব্যাপারটা কি জানিস, সেদিন কানুবাবুর মা আমাদের সবার যা যত্ন করেছিলেন, আমাদের সকলেরই উচিৎ ছিল তাঁকে একটা প্রণাম করা”।

“করলে না কেন?”

“কি করে করব? আর কেউ তো করেনি। আমি তাঁকে প্রণাম করলে অন্যরা হয়তো ইচ্ছা না থাকলেও কাজটা করতে বাধ্য হত। সেটা হয়তো অনেকেরই ভাল লাগতো না, কানুবাবুরা তো আর ব্রাহ্মণ নন”। তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ফের বলেছিলেন, “সংসারে যার যেটা প্রাপ্য, অনেকেই সেটা পায়না, আবার অনেকেই অযাচিতভাবে অনেককিছু পেয়ে যায়, যোগ্যতা না থাকা সত্বেও। বড় হ’, বুঝবি”।

কচি বয়েস আমার তখন, তাই সেই বৃদ্ধার জন্য খুব খারাপ লেগেছিল । মনে মনে ঠিক করেছিলাম, পরেরবার বড়কাকুর বাড়ি গেলে টুক করে গিয়ে তাঁকে একটা প্রণাম করে আসব। কিন্তু পরেরবার যখন গেলাম, শুনলাম তার কিছুদিন আগে তিনি মারা গিয়েছেন।

Advertisements

এক মুঠো ছবি

গত দুই-আড়াইমাসে অনেকগুলো সিনেমা দেখে ফেলেছি। বাড়ির সামনে, একদম হাঁটাপথে, সিনেমাহল্‌ থাকার এই এক সুবিধে। কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ শনিরবির বিকেলে ভাতঘুম দিয়ে উঠে যদি সিনেমা পায়, টুকটুক করে হেঁটে চলে যাই হুমায়। টিকিট না পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই, বরং আমাদের ক্ষেত্রে উল্টোটাই একবার হয়েছিল, ‘রয়’ দেখতে গিয়ে আমরা মাত্র দুজন দর্শক ছিলাম বলে আমাদের টিকিট দেয়নি। তাছাড়া হুমার অবস্থা অনেকটা একদা-ধনেখালি-এখন-ট্যাঁকখালির জমিদারবাড়ির মতন, চাকচিক্য নেই বলে জেন-ওয়াই খুব একটা আসেনা এখানে।

সিনেমা দেখার ব্যাপারে আমি অত্যন্ত সহিষ্ণু। একটা সিনেমা দেখা শুরু করলে আমি সেটা পুরোটা দেখার চেষ্টা করি, খুব কমক্ষেত্রেই এরকম হয়েছে যে সিনেমাটা আমি শেষ করতে পারিনি। আমার কেন জানিনা মনে হয়, এই যে এতজন মানুষ মিলে এত খেটেখুটে একটা সিনেমা বানায়, তাদের পরিশ্রমের দাম দেওয়ার জন্যেই আমার উচিৎ সিনেমাটা শেষ করা, গুণাগুণের বিচার তো আসবে তার পরে। তাছাড়া আমি এমন কিছু হনু লোক নই যে দুইঘন্টা জীবন থেকে চলে গেলে মহাভারত-রামায়ণ অশুদ্ধ হয়ে যাবে। এই গুণটা আমার গিন্নীর মধ্যেও আছে, কাজেই বেশ সুবিধেই হয়েছে বলতে হবে।

রোহিত শেট্টির ‘দিলওয়ালে’ সিনেমাটা দেখে অধিকাংশ দর্শকই খুশী হননি, শাহরুখ-কাজলের অন-স্ক্রীন রোমান্স দেখতে পাননি বলে। সিনেমার তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে রাজ ওরফে কালি-রূপী শাহরুখ আর মীরারূপী কাজল নিজেদের মধ্যে মারামারি করে গেছেন, প্রেমের দায়িত্বটা বরং পালন করেছেন বরুণ ধাওয়ান আর কৃতি শ্যানন।

dw_1

আমার কিন্তু সিনেমাটা মন্দ লাগেনি, বরং ফুল্টু এন্টারটেনমেন্ট-মার্কা মনে হয়েছে। ভুললে চলবে না, ছবির পরিচালকের নাম রোহিত শেট্টি, তাই তাঁর পক্ষে যা সম্ভব, যতটা সম্ভব, এবং যেভাবে সম্ভব, তিনি সেভাবেই সেসব দেখিয়েছেন। নিজের ঘরাণা অনুযায়ী দামীদামী গাড়ি উল্টেছেন, স্ল্যাপস্টিক কমেডি রেখেছেন, মার্কামারা বোকাবোকা সংলাপ রেখেছেন, যা শুনে মাঝেমাঝেই মনে হয়েছে হাসব না কাঁদব! পুলকখুড়োর কথা অনুযায়ী, “আর কি চাই লালু বল্‌?” আমার তো রামলাল-পোগো, মণিভাই-অস্কারভাই, কিং ডন এদের বেশ লেগেছে। আড়াইঘন্টা ধরে এরকম হুল্লোড়বাজি দেখার পরে মনটা পুরো ফুরফুরে হয়ে গিয়েছিল, সেটা বলতেই হবে।

অরিন্দম শীলের পরিচালিত ‘আবর্ত’ আর ‘এবার শবর’ দুটো ছবিই ভাল লেগেছিল। তাই তিনি যখন ব্যোমকেশকে নিয়ে ফিল্ম বানালেন, সেটাও আবার আমার অন্যতম প্রিয় একটা উপন্যাস ‘বহ্নি পতঙ্গ’ অবলম্বনে, তখন সেটা দেখার জন্য বেশ মুখিয়ে ছিলাম। এমনিতেই মুম্বইতে বাংলা ছবি বড় একটা আসেনা, তাই কালেভদ্রে যা দু’একটা এসে পড়ে, সেগুলো মিস্‌ না করারই চেষ্টা করি।hhb_1

কিন্তু ছবিটা দেখে হতাশ হলাম।

অঞ্জন দত্তের ছবিতে ব্যোমকেশ হিসেবে আবীর যতটা শার্প, এখানে ঠিক ততটা লাগেনি। বাকি চরিত্ররাও তাঁদের যথাসাধ্য করেছেন, কিন্তু রহস্যটা ঠিক দানা বাঁধেনি। সাংসারিক আলাপচারিতা আর গীতগোবিন্দর ফাঁকে ফাঁকে দায়সারাভাবে যেন রহস্যভেদ হয়ে গেল, ঠিক জমলো না। তার ওপর প্রথম সিনে চলন্ত ট্রেনে ডাকাত ধরা আর শেষ দৃশ্যে গুন্ডা ঠ্যাঙ্গানো – এ দুটো না রাখলেও চলত।

এরপর আসি সঞ্জয় লীলা বনশালীর ‘বাজিরাও মাস্তানি’ ছবিটার কথায়। বনশালীর ছবি মানেই বিশাল বিশাল সেট, চমকদার সব পোশাক-আশাক আর দুজন নায়িকা থাকলেই যে-কোনোভাবে তাঁদের একসঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে নাচানো। এখানেও তার কোনো অন্যথা হয়নি। সেট – সে পেশোয়াদের বাসভবনই হোক বা যুদ্ধক্ষেত্রই হোক – দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। বড় পর্দায় দেখার আদর্শ ছবি একেবারে। বাস্তবে কাশীবাঈ আর মস্তানি কোনোদিন মুখোমুখি হয়েছিলেন কিনা জানিনা, তবে সঞ্জয় তাঁদের নিয়ে ‘পিঙ্গা’ গান বেঁধেছেন, এমনকি প্রবল পরাক্রমশালী বাজিরাওকেও ‘মল্‌হারী’ গানের তালে তালে একটা অদ্ভুত নাচ নাচিয়েছেন।bm_1

মরাঠি একজন সহকর্মীকে ফিল্মটার সত্যতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করাতে সে মাছি তাড়ানোর মতন ভঙ্গী করে বলেছিল, “সঞ্জয়ের কাছে সঠিক ইতিহাস আর ববি দেওলের কাছে হিট ফিল্ম – আশা করলেই ঠকবে”।

বোঝো!

তবে ইতিহাসের খামতিটা পুষিয়ে গেছে অভিনয়ে। প্রত্যেকে দারুণ অভিনয় করেছেন। দীপিকাকে দুর্দান্ত লেগেছে, দিনেদিনে তিনি নিজেকে একটা অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই ছবির সবচেয়ে বড় চমক তন্‌ভী আজমি – ন্যাড়া মাথায় যে অভিনয়টা তিনি করেছেন, সেটা এককথায় অনবদ্য।

সন্দীপ রায় মূলত ফেলুদাকে নিয়ে সিনেমা বানালেও, কেন জানিনা তাঁর নন-ফেলুদা ফিল্মগুলোই আমার বেশী ভাল লাগে। ‘নিশিযাপন’ বেশ ভাল লেগেছিল, ‘হিটলিষ্ট’, ‘যেখানে ভূতের ভয়’ আর ‘চার’ ছবিগুলোও মন্দ লাগেনি। তাই ‘মনচোরা’ দেখার সুযোগ যখন পেলাম, ছাড়লাম না। তাছাড়া যে ছবির মুখ্য চরিত্রে আবীর, রাইমা, শাশ্বত আর পরাণ ব্যানার্জী থাকেন, সেই ছবি অন্তত একবার তো দেখাই যায়।

mc_1

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে বানানো এই ছবিটা বেশ মিষ্টি একটা প্রেমের গল্প, যেটা দেখার পরে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যাবে। সঙ্গে হাল্কা একটু রহস্যের বাতাবরণও আছে, তাই সবমিলিয়ে বেশ জমজমাট ব্যাপার।

অক্ষয়কুমার লোকটার ওপর আমার খুব ভক্তি হয়। হবে না-ই বা কেন? যিনি ‘সবসে বঢ়া খিলাড়ী’ থেকে ‘হেরা ফেরী’, ‘আফলাটুন’ থেকে ‘ওঃ! মাই গড’, ‘সিং ইজ কিং’ থেকে ‘স্পেশাল ছাব্বিশ’ সমান দক্ষতায় নামাতে পারেন, তাঁর অভিনয়ের রেঞ্জ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকা উচিৎ নয়, অন্তত আমার তো নেই।

তবে ‘এয়ারলিফ্‌ট’ সিনেমাটা আমি অক্ষয়ের জন্য দেখতে যাইনি, গিয়েছিলাম ছবিটার বিষয়বস্তুর জন্য। সত্য ঘটনা অবলম্বনে ফিল্ম আমাদের দেশে খুব কমই হয়, তাই এই ধরণের ছবিগুলো আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখি।

a_1

পরিচালক রাজাকৃষ্ণ মেনন ফ্যাক্ট এবং ফিকশন মিশিয়ে সুন্দর একটা কক্‌টেল তৈরি করেছেন, আর তার মধ্যে পরিমাণমত দেশভক্তিও মিশিয়েছেন। আম্মান এমব্যাসিতে যখন তেরঙ্গাটা শেষমেশ উড়লো, তখন আমার মতন নিরেটের চোখেও জল এসে গিয়েছিল। অভিনয়ে নিমরত কাউর থেকে শুরু করে খিটকেল জর্জ কুট্টির ভূমিকায় প্রকাশ বেলাওয়াড়ি, সকলেই মাতিয়ে দিয়েছেন, তবে বিশেষভাবে মনে ছাপ ফেলেছেন পূরব কোহ্‌লি। ছবির শেষে অবশ্য নতুন করে আবার অক্ষয়কুমারের প্রেমে পড়ে গেলাম। লোকজন বলছে এটাই নাকি অক্ষয়ের শ্রেষ্ঠ অভিনয়। শ্রেষ্ঠ কিনা জানিনা, তবে অসাধারণ অভিনয় করেছেন রাজীববাবু, সেটা বলতেই হবে।

বাংলায় গত এক-দেড় বছর ধরেই থ্রিলার এবং রহস্যকাহিনী অবলম্বনে সিনেমা তৈরির রমরমা। সবগুলোই যে উৎরোচ্ছে তা নয়, তবে কিছু সিনেমা বেশ ভাল হচ্ছে। সেই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন শুভ্রজিত মিত্র পরিচালিত ‘চোরাবালি’। আগাথা ক্রিস্টির লেখা ‘কার্ড্‌স অন দ্য টেবিল’ উপন্যাস অবলম্বনে এটি তৈরি হয়েছে। তবে পরিচালক মূল গল্পের কাঠামোটাকে এক রেখে বাকিটা নিজের মতন করে সাজিয়ে নিয়েছেন। গোয়েন্দাকে বদলে করেছেন অপরাধবিদ আর কিউরিও সংগ্রাহক এর বদলে এনেছেন ডাক্তারকে। তবে ভাল ব্যাপার এটাই যে বদলগুলো মোটামুটি খাপ খেয়ে গেছে ছবির আবহের সঙ্গে।cb_1

ছবির একেবারে শেষে গিয়ে পরিচালক নিজের মতন করে একটা ট্যুইস্টও রেখেছেন, যেটা অবশ্য না হলেও হয়তো চলত।

অভিনয়ে সবাই মানানসই। বরুণ চন্দ, জর্জ বেকার, তনুশ্রী চক্রবর্তী, লকেট চ্যাটার্জী, জুন মালিয়া, শতফ ফিগর, সমদর্শী দত্ত, মালবিকা ব্যানার্জী – সবাই বেশ ভাল অভিনয় করেছেন। ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার আর ডাক্তারের চরিত্রে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের নাম জানিনা, তবে ডাক্তার ভদ্রলোকের সঙ্গে যুবাবয়েসের অরিন্দম শীলের একটা মিল আছে।

শেষ করি ইমতিয়াজ আলির ‘তামাশা’ ছবিটার কথা বলে, কাকতালীয়ভাবে যেটা এই সবকটা ছবির আগে রিলিজ করেছিল। ছবিটা আমার খুব ভাল লেগেছে। আমাদের দেশের খুব প্রাচীন একটা আর্ট, যেটা কিনা এখন প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছে, সেই ‘স্টোরিটেলিং’ বা মুখে মুখে গল্প বলা হল ছবিটার বিষয়বস্তু। তবে তার মাঝে বাণিজ্যিক ছবির চাহিদা অনুযায়ী নাচগান আছে, কর্সিকার দুর্দান্ত প্রকৃতি আছে, প্রেম-বিরহ-মিলন আছে, জগঝম্প নাচগানও আছে।

T_1

আর আছে রণবীর কাপুর আর দীপিকা পাডুকনের দুর্দান্ত কেমিষ্ট্রি। দুজনেই ফাটিয়ে অভিনয় করেছেন। ছবির দ্বিতীয়ার্ধে যেখানে বেদ তা্র বাবাকে গল্প বলে শোনাচ্ছে, সেই সিকোয়েন্সটা জাস্ট ফাটাফাটি লেগেছে। গল্পবলিয়ের ভূমিকায় পী্যুষ মিশ্রও যথারীতি দারুণ। ছবির ন্যারেটিভটা শুরুতে একটু খটোমটো লাগলেও, সময়ের সাথে সাথে বেশ মানিয়ে গিয়েছে। পুরো ছবিটা দেখার পরে মনে হয়েছে যে এই ধরণের গল্প এভাবে বললেই বরং বেশী উপভোগ্য হয়।

ছবিটা ভাল লাগার আরো একটা কারণ আছে। বেদ আর তার অফিসের বস্‌-এর মধ্যে একটা কথোপকথন আছে, যেটা দেখে আমি স্রেফ ফিদা হয়ে গিয়েছি। দেখতে দেখতে বারবার মনে হয়েছে, ইস্‌, আমিও যদি এরকম একটা তামাশা করতে পারতাম!

(ছবি উৎসঃ গুগ্‌ল্‌)