রাজধানীতে শ্রমিক দিবস

অনেকদিন বাদে এই সপ্তায় একটা লম্বা সপ্তাহান্ত পাওয়া গিয়েছিল মে দিবসের কল্যাণে। ঐতিহাসিক মে দিবস এখন প্রাগৈতিহাসিক হয়ে গেছে। ‘শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ’, ‘মেহনতি মানুষ জিন্দাবাদ’ এইসব কথাগুলো এখন আলাদা করে কারো মনে আর আলোড়ন তোলেনা মনে হয়। বিশ্বায়নের তুমুল হুজুগে এখন সবাই শ্রমিক – কারো হাতে গাঁইতি, আর কেউ বা কুলি আইটি। কারখানার মালিকের রোষানলের জায়গায় ক্লায়েন্টের মোলায়েম হুমকি, বেলা বারোটার ভোঁ-এর জায়গায় ডেলিভারেব্ল-এর ডেডলাইন – হরেদরে ব্যাপারটা সেই উনিশ-বিশ। সপ্তাহে একদিনের খাটুনি বাঁচবে সেটাই আসল, বাকি তত্বকথা বাহুল্যমাত্র।

মে দিবসে সকালে চা-বিস্কুট আর বেলায় টোষ্ট খেয়ে ভাবছিলাম লাঞ্চটা যদি বাইরে সারা যায়। তবে ভাবনা আর তার বাস্তবায়নের মধ্যে একটা ছোট্ট বাধা ছিল। মুম্বইতে এখন ফাটানো গরম। এই গরমে বাইরে গিয়ে লাঞ্চ করতে হবে – শুধু এইটুকু ভেবেই আমি কুলকুল করে ঘামতে থাকি। সকালে রোদ্দুর আর বিকেলে ল্যাদ – এই দুটো অসুবিধের জন্য নর্মালি আমরা আজকাল খাবার বাড়িতে আনিয়েই খাই, তাতে সবদিকই বজায় থাকে।

গিন্নিকে ব্যাপারটা বলতেই ও এককথায় রাজি হয়ে গেল। এইসব বাইরে খাওয়াটাওয়ার ব্যাপারে ওর উৎসাহ আমার থেকেও বেশি। সাধে কি আর আমি ওকে এত ভালবাসি? কিন্তু ওর পরের কথাটা শুনেই ঘাবড়ে গেলাম। গিন্নি বলল, “আজকে হোম ডেলিভারি খাব না, বাইরে যাব!”

মে দিবসে প্রতিবাদ জানানোটা অবশ্যকর্তব্য, সে যত ছোটখাট বিষয়েই হোক না কেন। তাছাড়া এই ঠাঠাপোড়া রোদ্দুরে বাইরে যাওয়াটা ছোট ব্যাপার নয় মোটেও, অন্তত আমার কাছে। তাই তেড়ে প্রতিবাদ জানালাম।

কোনো এক দার্শনিক বলে গিয়েছেন, “A family consists of two people – One, who is always right, and the Husband!” অতএব, বলাই বাহুল্য, এক্ষেত্রে আমার প্রতিবাদ কোনো পাত্তাই পেলনা, স্রেফ উড়ে গেল। দমে গিয়ে বললাম, “কোথায় যেতে চাও?”

তুরন্ত জবাব এল – “রাজধানী”!

“রাজধানী!? মানে ভেজ রেস্টুরেন্ট?”

“আর কটা রাজধানী রেস্টুরেন্ট তুমি চেনো?”

বিমর্ষ হয়ে বললাম, “না মানে ইয়ে, ছুটির দিনে নিরামিষ খাবে?”

গিন্নি বলল, “অসুবিধে কোথায়? তাছাড়া এখন তোমার পরপর তিনদিন ছুটি, আমিষ খাওয়ার অনেক সময় পাবে। আমি রাজধানীর ওই থালিটা একবার খেতে চাই, আর আজকেই খেতে চাই!”

রাজধানীতে যাওয়া নিয়ে এর আগেও অনেকবার আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আরসিটি মল্‌-এ আমরা যখনই যাই, তখনই রেস্তোঁরাটা চোখে পড়ে, সঙ্গে গিন্নির বলা ওই থালির ছবিটাও। এর আগেও অনেকবার গিন্নি আমার কাছে প্রস্তাব রেখেছে ওখানে যাওয়ার জন্য, আর প্রতিবারই আমি নানা অছিলায় সেটা কাটিয়ে গেছি। পয়সা খরচা করে নিরামিষ রেস্তোঁরায় যায় নাকি কেউ?

কিন্তু বুঝলাম, আজ আর ঠেকানো যাবে না। বঙ্গবন্ধু ভর করেছেন আজ আমার গিন্নিকে। দার্শনিকের কথা বেদবাক্য মনে করে এটাও মেনে নিলাম।

হোক্‌ তাহলে!

******

নিরামিষ রেস্তোঁরাতেও যে ঢোকার জন্য লাইন দিতে হয়, সেটা সেদিন টের পেলাম। উঁকি মেরে দেখলাম, ভেতরে প্রচুর লোক, মনের আনন্দে থালি সাঁটাচ্ছে, আর বাইরে লোকজন জুলজুল চোখে সেদিকে তাকিয়ে উইন্ডো ইটিং করছে। তবে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হল না, আমরা দুজন ছিলাম বলে অন্যদের আগেই আমাদের ডাক পড়লো, বাকিদের ঈর্ষাভরা চোখের সামনে দিয়ে মুচকি হেসে আমরা ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

গুছিয়ে বসতে না বসতেই দুজন আমাদের দিকে ছুটে এল। একজনের হাতে জলের বোতল আর চারটে গেলাস, আর অন্যজনের হাতে দুটো প্রকান্ড থালা আর অনেকগুলো বাটি। থালাদুটো আমাদের সামনে বসিয়ে টুকটুক করে ওর ওপরে বাটিগুলো সেট করে দিল। গুণে দেখলাম, নটা বাটি আছে।

এরপর যেটা হল, সেটার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। চোখের নিমেষে একজন চলে এল হাতে একটা ডান্ডা নিয়ে, তাতে তিনটে খোপ। সেই খোপের মধ্যে হাতা ডুবিয়ে পটাপট তিনটে বাটি ভরে দিল। সে যেতেই অন্য আরেকজন এসে অন্য তিনটে, এবং তার কাজ শেষ হতেই তৃতীয় একজন এসে বাকি তিনটে বাটি ভরে দিল। গোটা ব্যাপারটা ঘটলো এক মিনিটেরও কম সময়ে।

দেখেশুনে পুরো হুব্বা হয়ে গেলাম। গুগাবাবার সেই সিন্‌টা মনে পড়ে গেল, যেখানে হাতে তালি দেওয়ার পরে গুপি-বাঘার সামনে থালাবাটিগুলো নানাবিধ খাবারে ভরে উঠছিল। কিন্তু সেটা ছিল ক্যামেরার কারসাজি, আর এটা একদম চোখের সামনে দেখা ভোজবাজি।

ভাত বা রুটি কিছু নেই কেন, এটা সবে ভাবা আরম্ভ করেছি, এমন সময় আরেকজন এসে থালার মাঝখানে কয়েকটা রুটি, লুচি, কিছু পাঁপড়ভাজা, একটা ধোকলা আর একটা শিঙ্গাড়া দিয়ে গেল, সেইসঙ্গে রুটির ওপর চামচে করে কি যেন ঢেলে দিল। জিজ্ঞেস করলাম, “ইয়ে ক্যা হ্যাঁয়?” লোকটা তখন অ্যাবাউট টার্ন মেরে অর্ধেক রাস্তা চলে গেছে, ঘাড় ঘুরিয়ে জবাব দিল, “ঘি!”

এইবারে একটু হাঁফ ছেড়ে বাটিগুলোর দিকে তাকালাম। বাটিগুলোতে ছিলঃ

১। পাঁচমিশেলি তরকারি – পটলের প্রাধান্য বেশি।

২। পালক পনীর – পনীর কম, পালক বেশি (যথারীতি)।

৩। আলুরদম – ঠিকঠাক।

৪। ডাল বাটি চুর্মা – আগে কখনও খাইনি, তাই ভালই লাগলো।

৫। ডাল – ঠিকঠাক।

৬। হলুদ রঙের একটা বস্তু – খেয়ে ঠিক স্বাদটা ঠাহর করতে পারিনি, আমার চেনা খাবারের মধ্যে টকডালের সঙ্গে মিল সবথেকে বেশি।

৭। আমরস – ফাটাফাটি।

৮। টক আর মিষ্টি দইয়ের একটা মিক্সচার – দিব্যি খেতে।

৯। চাট – যেরকম হয়ে থাকে আর কি!

একসঙ্গে এতগুলো নিরামিষ পদ আমি আগে কোনোদিন খাইনি, পরেও আর কোনোদিন খাবো কিনা জানিনা। অল্প অল্প করে সব খেয়েই পেটটা বেশ ভরে গেল। মাঝখানে একজন ভাত নিয়ে এসেছিল, কিন্তু সেটা আর চেখে দেখা হয়নি। আমপানার সরবত আর লস্যি দিয়ে খাওয়া শেষ করলাম।

খাওয়ার পরে হাত ধোবার জন্যেও উঠতে হল না, একজন একটা কমণ্ডলুর মতন পাত্র থেকে হাতে উষ্ণ জল ঢেলে দিল।

বিল দেওয়ার পরে দেখলাম থালিটার নাম হচ্ছে ‘মহারাজা থালি’। এইবার হাত ধুইয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। রাজা-মহারাজাদের এইভাবেই খাবার পরে হাতটাত ধুইয়ে দেওয়া হত বটে! যাক্‌, এরা অন্তত শেষটা মেইনটেইন করতে পেরেছে। একথোকা কালো আঙ্গুর মুখের সামনে ধরাটাই বাকি ছিল শুধু।

মিছরি আর মৌড়ি চিবোতে চিবোতে ভাবলাম, ভাগ্যিস এসেছিলাম, নইলে এই অভিনব অভিজ্ঞতাটা হতনা। মনে মনে গিন্নিকে ধন্যবাদ দিয়ে রাজধানী ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।

মে দিবস জিন্দাবাদ।

স্যাম্পেল থালি, আমাদেরটা ঠিক এরকম ছিল না।
স্যাম্পেল থালি, আমাদেরটা ঠিক এরকম ছিল না।

(ছবি উৎসঃ গুগ্‌ল্‌)

Advertisements

মৎস্যপুরাণ

মাছ প্রসঙ্গে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের সেই গল্পটা সবারই জানা। সেই যে নাসিরুদ্দিন একজন যোগীবাবার কাছে গিয়ে বলেছিলেন যে একটি মাছ একবার তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিল। সেই শুনে যোগীবাবা একইসঙ্গে কৌতূহলী হয়েছিলেন এবং ফ্রাস্ট্রু খেয়েছিলেন। কৌতূহলের কারণটা সহজেই অনুমেয়, আর ফ্রাস্ট্রু খাওয়ার কারণটা হল এই যে আজীবন সাধনা করেও তিনি নাসিরুদ্দিনের ওই লেভেলে উঠতে পারেননি। অনেকবার অনুরোধ-উপরোধ করার পরে অবশেষে মোল্লা রহস্যটা ভেঙেছিলেন এই বলে, “একবার খিদের চোটে প্রচন্ড কাহিল হয়ে পড়েছিলাম, তখন অনেক চেষ্টা করে একটা মাছ ধরে তাকে ভেজে খাই। তাতেই আমার প্রাণরক্ষা হয়”। যোগীবাবার রি-অ্যাকশনটা পাওয়া যায়নি, তবে খুব যে ভাল কিছু হবেনা, সেটা বলাই বাহুল্য।

ভাতমাছপ্রিয় বাঙালির প্রিয় স্লোগান ‘মৎস্য ধরিব খাইব সুখে’। এখন অবশ্য এই জেটগতির কর্পোরেট যুগে মাছ ধরার মতন সময় কারোর হাতেই নেই, তাই পুরনো স্লোগানটা বদলে গিয়ে ‘মৎস্য কিনিব খাইব সুখে’-তে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে খাওয়ার সুখ যে মাছেই, সেই ব্যাপারটা কিন্তু বদলায়নি। একটা বেশ বড় ত্রিভুজাকৃতি রুইমাছের গাদা, তার সঙ্গে একটা প্রমাণ সাইজের আয়তক্ষেত্র পেটি পাতে পড়লে যে স্বর্গীয় অনুভূতিটা হয়, সেটার জন্যেই তো বেঁচে থাকা। কোথায় লাগে এর কাছে পিজ্জা-পাস্তা-লাসাগ্‌না সম ম্লেচ্ছ খাবারদাবার?fish_2

মাছের প্রতি ভালবাসাটা আমি পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। ছোটবেলায় ছুটিছাটার দিনে বাবার সঙ্গে মাছ দেখতে যেতাম। মাছের বাজার মানেই কাদা-প্যাচপ্যাচে একটা ব্যাপার। আমার অবশ্য বেশ লাগতো। সেই কাদার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখতাম মাছওয়ালারা নানা ধরণের মাছ, আর নানা সাইজের আঁশবঁটি নিয়ে বসে খদ্দেরদের ডাকাডাকি করছেন। বড়-ছোট-মাঝারি বিভিন্ন সাইজের মাছ, জ্যান্ত-মড়া-বরফ দেওয়া বিভিন্ন অবস্থায় শোভা পাচ্ছে।

আমার পছন্দ ছিল রুই-কাতলা-মৃগেল জাতীয় বড় মাছ, বড় মাছে কাঁটা কম বলে। কাঁটাওয়ালা মাছ আমার একেবারেই অপছন্দ ছিল।

আমার অবস্থা দেখে বাবা বলতেন, “ওরে বোকা, যে মাছে যত কাঁটা, তার টেস্ট তত বেশি, বুঝলি?” শুধু বলেই ক্ষান্ত হতেন না অবশ্য, হাতেকলমে থিওরীটা প্রমাণ করার জন্য মাঝেমাঝেই প্রচুর কাঁটাওয়ালা মাছ নিয়ে আসতেন বাড়িতে। সেই সুবাদেই আমি খয়রা, খলশে, ফ্যাসা ইত্যাদি মাছ খেয়েছি। তবে কাঁটা ম্যানেজ করতে শিখে বুঝেছিলাম, বাবার থিওরীটা ভুল নয় মোটেই।

মাছ খাওয়ার ব্যাপারে আমি সর্বভুক – স্যামন থেকে শুঁটকি, সব খাই। অনেক মানুষ দেখেছি, যারা মাছের খুব ভক্ত হয়েও শুঁটকিটা এড়িয়ে চলেন, মূলত গন্ধের জন্য। শুনেছি শুঁটকি রান্না করার সময় বিকট গন্ধ বেরোয়, ঘরের লোকজন তো বটেই, পাড়া-প্রতিবেশীরাও নাকি বুঝতে পারেন যে আশেপাশে বৈপ্লবিক কিছু একটা রান্না করা হচ্ছে। ‘শুনেছি’ বলছি এইজন্য যে আমাদের বাড়িতে ওই গন্ধের কারণেই শুঁটকি রান্না হত না। তাই বলে আমাদের খাওয়া আটকাবে কে? মামাবাড়িতে যখনই রান্না হত, আমাদের ডাক পড়ত, আর নেহাৎই যেতে না পারলে আমার আর বাবার জন্য দুটো টিফিনবাটি চলে আসতো। মামীমা শুঁটকিটা অসাধারণ বানাতেন। ঝালের চোটে ব্রহ্মতালু অবধি জ্বলে যেত, আর চোখেরজলে-নাকেরজলে হয়েও আমি হাপুসহুপুস করে একথালা ভাত সাবড়ে দিতাম। মেজজেঠুর বাড়িতেও শুঁটকি রান্না হত, যেটা আসত আগরতলা থেকে। তার স্বাদ আলাদা, কিন্তু খেতে একইরকম দুর্দান্ত। আসলে শুঁটকির প্রিপারেশনের ভালত্বটা নির্ভর করে রাঁধুনীর ওপর। এর জন্য একটা আলাদা লেভেলের এলেম লাগে, যেটা সবার থাকেনা।

তবে দুঃখের কথা এই যে, দুটো বাড়িতেই এখন শুঁটকি রান্না বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে আমারও শুঁটকি খাওয়া গিয়েছে বন্ধ হয়ে।

বয়েসের সাথে সাথে আমার পছন্দের রেঞ্জটাও বাড়তে শুরু করেছিল। ছোট এবং মাঝারি মাছ যে রুই-কাতলাকে সমানে সমানে টেক্কা দিতে পারে, এমনকি তেমন আর্টিস্টের হাতে পড়লে স্বাদের ব্যাপারে ছাড়িয়েও যেতে পারে, সেটা বুঝতে শিখেছিলাম।

মৌরলা মাছের ঝাল আর টক – দুটোই খুব স্বাদু জিনিস, ভাজার কথা আর নাই বা বললাম! আমার কাকীমা কাচকি মাছের একটা শুকনো-শুকনো প্রিপারেশান বানান। কাকুর বাড়িতে বেড়াতে গেলে এই জিনিসটা যেদিন মেনুতে থাকে, সেদিন আমার অন্যকিছু না হলেও চলে, অদ্ভুত ভাল খেতে পদটা।

মাঝারি নয়, তবে ছোটর থেকে একটু বড়, সেরকম কয়েকটা মাছের স্বাদও অসাধারণ। আমোদি মাছ যেমন – কড়া করে ভেজে ডাল দিয়ে খেতে ব্যাপক লাগে। কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়ে পাতলা করে বানানো কাজলী মাছের ঝোল, যেরকম উপাদেয়, সেরকমই স্বাস্থ্যকর।

মাঝারি মাছের ভ্যারাইটি প্রচুর। পার্শে, পাবদা, ট্যাংরা, তেলাপিয়া, বাটা, বেলে, রূপচাঁদা, কৈ – নাম বলে শেষ করা যাবেনা। এইসব মাছ হাল্কা ঝোলের চেয়ে শর্ষেবাটা কিংবা পেঁয়াজ দিয়ে জমে ভাল। তবে এদের মধ্যে আমার সবথেকে প্রিয় হল ট্যাংরা, পার্শে আর পাবদা। এই তিনটে মাছ মাঝারি এবং বড়, দুই সাইজেই পাওয়া যায়, এবং বানানোর রকমফেরে স্বাদও বদলে বদলে যায়।

ট্যাংরার কথাই ধরা যাক। ডিমভরা বড় সাইজের ট্যাংরা শীতকালে পেঁয়াজকলি দিয়ে বানালে ফাটাফাটি লাগে। যাঁরা স্বাস্থ্য বজায় রাখতে চান, তাঁরা বেগুন দিয়ে পাতলা ঝোল বানিয়ে খেতে পারেন, খারাপ লাগবে না।

fish_3

পাবদার ওপর আমার একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে। পাবদারও নানারকম প্রিপারেশান হয়, তবে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে কালোজিরে-কাঁচালঙ্কা দিয়ে বানানো বড় সাইজের পাবদার ঝোলটা। থালা জুড়ে শুয়ে থাকা একটা পাবদা দেখে মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয় আমার।

শীতকালে আমার আর একটি প্রিয় পদ হল আলু-ফুলকপি দিয়ে বানানো তেলাপিয়া কিংবা কৈ মাছের ঝোল, আর নামানোর আগে তাতে কিছু ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলে ষোলোকলা পূর্ণ হয়। কৈ মাছের আর একটা খুব বিখ্যাত প্রিপারেশান আছে – তেল কৈ, কিন্তু কেন জানিনা, ওটা আমার ওভারহাইপড্‌ বলে মনে হয়।

এতটা যদি কেউ পড়ে ফেলেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন যে বিদেশে যাওয়ার সময় যখন সবাই আমাকে “ওখানে মাছ পাওয়া যায়না কিন্তু!” বলে ভয় দেখিয়েছিল, তখন আমার মনের অবস্থা কি হয়েছিল! কিন্তু অকুস্থলে পৌঁছে দেখলাম, ব্যাপারটা আদপেই সেরকম নয়। দেশীয় মাছ তো পাওয়া যেতই, সঙ্গে বিভিন্ন রকমের বিজাতীয় সামুদ্রিক মাছও মিলত। দেশীয় মাছের ক্ষেত্রে একটা অসুবিধে অবশ্য ছিল – সেগুলো বেশ পুরনো, আর অতদিন বরফে থাকার ফলে তাদেরকে মার্ডার ওয়েপনও বলা যায়, কিন্তু ওইটুকু অসুবিধের সঙ্গে আমি অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছিলাম।

বিজাতীয় মাছগুলো অবশ্য প্রায় সবই নতুন ছিল আমার কাছে। টুনা, স্যামন, সোয়াই, ম্যাকারেল, সার্ডিন, বাসা, কিংফিস – এইসব মাছগুলো হুলিয়ে খেয়েছিলাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল টুনা মাছের তরকারি। টুনা জিনিসটা সাধারণত ক্যানে পাওয়া যেত, ক্যানের ভেতরে জলের মধ্যে ছোট ছোট সেদ্ধ টুনার টুকরো। আমেরিকানরা ওই স্বাদহীন সেদ্ধ জিনিসটাই সোনামুখ করে খেয়ে নিত। কিন্তু আমি ব্যাপারটা নিয়ে একটু পাকামি করতাম। পেঁয়াজ-রসুন-কাঁচালঙ্কা অল্প তেলে খানিক নেড়েচেড়ে, দরকারমতন মশলাপাতি দিয়ে, তার মধ্যে ওই টুনার টুকরোগুলো ফেলে দিতাম, একটা মাখামাখা তরকারি তৈরি হত, আর নামানোর আগে খানিক ধনেপাতা। প্রথম যেদিন পদটা খেয়েছিলাম, একদম ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের রান্না বলে বলছি না, উৎসাহীরা ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, ঠকবেন না।

স্যামন মাছও নানারকমভাবে বানিয়ে খেতাম – শর্ষে-স্যামন, বেক্‌ড স্যামন, স্যামনের ঝাল, গ্রিল্‌ড্‌ স্যামন – একেকটা পদের একেক রকম স্বাদ, আর প্রতিটাই ভাল খেতে। এছাড়া ওখানকার পমফ্রেট মাছগুলোও স্পেশাল ছিল। অত বড় পমফ্রেট তার আগে আমি চোখেই দেখিনি, খাওয়া তো দূর অস্ত! থাইল্যান্ড থেকে আসত তারা, আর একেকটার ওজন ছিল প্রায় হাফকেজি ! আমরা ‘রাক্ষুসে পমফ্রেট’ বলতাম। তার স্বাদ ছিল বড় ভাল, এখনও মুখে লেগে আছে।

শেষ করি বাঙালির আরেকটি চিরকালীন ফেবারিট মাছের কথা বলে। সেই মাছকে ভেজে, বেগুন দিয়ে ঝোল করে, শর্ষে দিয়ে ভাপা করে, কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে – যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন, তার রেজাল্ট অনবদ্য ছাড়া আর কিছু হতেই পারেনা। যে তেলে তাকে ভাজা হয়, সেই তেল দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ার মধ্যেও একটা অদ্ভুত রোমান্টিসিজম্‌ আছে।

সাধে কি আর টিউবলাইট কোম্পানীর একটা পুরনো অ্যাডের স্লোগান ছিল –

“বাতির রাজা ফিলিপ্স, আর মাছের রাজা ইলিশ”?

fish_4(ছবি উৎসঃ গুগ্‌ল্‌)