রিটার্ন গিফ্‌ট

“কাজটা কি ঠিক হল রাজামশাই? এখন যে ঘরে-বাইরে গালাগাল খাচ্ছেন”!

রাজামশাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে থাকেন। কী-ই বা বলবেন? যখন সব হিসেব গন্ডগোল হয়ে যায়, তখন চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় কি? কী ভেবেছিলেন, আর ঘটনাটা কি হল। হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছিল তাঁর।

রাজসিংহের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু আমার উদ্দেশ্য তো সৎ ছিল, নাকি সেটাও তুমি বিশ্বাস করো না?”

রাজসিংহ কথাটাকে বিশেষ পাত্তা দিলেন না বলেই মনে হল, একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই জবাব দিলেন, “আমার বিশ্বাসে আর কি আসে-যায় বলুন? আপনার এই হঠকারিতায় যে দেশের আপামর জনসাধারণের বিশ্বাসভঙ্গ হল, তার দায় কি আপনি নেবেন মহারাজ?”

মহারাজ ফের দমে যান।

রাজসিংহ অবশ্য দমেন না। মহারাজকে জ্ঞান দেওয়ার সুযোগ তিনি বড় একটা পাননা, তাই সুযোগ পেয়ে তিনি বলে চলেন, “ছোটমুখে বড় কথা বলে ফেলছি, মার্জনা করবেন। আপনার আক্কেল দেখে আমি সত্যিই মর্মাহত মহারাজ। সবকিছুর একটা নিয়মকানুন আছে, প্রোটোকল বলে একটা কথা আছে। কথা নেই বার্তা নেই, দুম করে আপনি রথের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিলেন? দিলেন তো দিলেন, একেবারে শত্রুপুরীর দিকেই ঘোরাতে হল? সব যদি ছেড়েও দিই, নিজের বিপদের কথাটাও তো একবার ভাবতে পারতেন মহারাজ? যদি আপনার কিছু হয়ে যেত?”

মহারাজ মনে মনে ভাবলেন, কি আবার হত, আমার জায়গায় তুমি রাজা হতে! এইসব আলগা দরদ দেখলেই মাথাটা গরম হয়ে যায় তাঁর। এদের শুধু মুখেই দরদ, আসলে হাতে রড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সুযোগ পেলেই পেছনে গুঁজে দেবে।

অন্যদিকে রাজসিংহ মনে মনে ভাবছিলেন, “কত করে বলে দিলাম বিদেশ থেকে ফেরার সময় আমার বউয়ের জন্য একটা শাল নিয়ে আসতে, সঙ্গে অন্য কিছু টুকিটাকি। হোয়্যাটস্‌অ্যাপে ছবি দেখে তো ভালই লেগেছিল, ঘরসংসার না করলে কি হবে, মালটার চয়েস আছে বটে! কিন্তু সেসব আমার হাতে না পৌঁছে কিনা পৌঁছে গেল ওই হাড়হাভাতে বেতমিজ শরিফটার হাতে? এ তো রীতিমত মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া! বেশ হয়েছে, দেখ্‌ শালা কেমন লাগে!”

মহারাজ বললেন, “কি বলছ হে রাজসিংহ? দেশটা আমাদের শত্রু হলেও সেখানকার রাজা আমার সাথে পরম মিত্রের মতই ব্যবহার করেছেন। সেখানে যে খাতির আমি পেয়েছি, সেরকম খাতির আমি অন্য অনেক জায়গাতেই পাইনি। আর তুমি তো জানোই, প্রোটোকল ব্যাপারটাকে আমি কোনোদিনই বিশেষ আমল দিইনি, এর আগেও আমি প্রোটোকল ভেঙেছি। কাজেই ওটা নিয়ে আমি বেশী ভাবিনা”।

“এটা ভারতবর্ষ মহারাজ, এখানে ওরকম হুটহাট নিয়মকানুন ভাঙা যায়না। মার্কিনদেশের বামা জকি পরে জগিং করলে ফেসবুকে হাজারটা লাইক পড়ে, কিন্তু আমাদের নীল মাফলার পরা লোকটা খালি গায়ে দশাশ্বমেধ ঘাটে ডুব দিলে পাবলিক আর মিডিয়ার কাছে খোরাক হয়ে যায়। তাছাড়া…”

উফ্‌! নীল মাফ্‌লার-পরা লোকটার কথা শুনেই মাথাটা চড়াৎ করে গরম হয়ে গেল মহারাজের। শালা যেদিন থেকে রাজধানীতে গেঁড়ে বসেছে, সেদিন থেকে দুদন্ড শান্তি দিচ্ছে না তাঁকে! রাজধানীর লোকগুলোরও বলিহারি, প্রথমবার এত নাটক করার পরেও দ্বিতীয়বার ফের তাকেই গদিতে বসিয়ে দিল! এই জন্যেই শালা দেশটার কিস্যু হবে না। উফ্‌, হাড়ে একেবারে দুব্বো গজিয়ে দিল! সাধে কি আর লোকটাকে সবাই খুজলীলাল বলে?

“… গুরুকুলে ভয়ানক ঝামেলা শুরু হয়েছে এটা নিয়ে, গুরুদেব তো রেগে একেবারে ফায়ার”।

বেশ উদাস হয়ে খুজলীলালের কথা ভাবছিলেন, রাজসিংহের কথার শেষটুকু শুনে আবার বাস্তবে ফিরে এলেন মহারাজ।

গুরুকুল!

নাঃ, ভীমরুলের হুল বলাই ভাল।

এখন মাঝে মাঝেই তিনি ভাবেন, কী কুক্ষণেই যে রাজা হওয়ার প্রস্তাবে রাজী হয়েছিলেন! শুরুর সেই দিনটা এখনও তাঁর চোখের সামনে ভাসে, সিংহাসনে সদ্য অভিষেক হয়েছে তাঁর, ছাপ্পান্ন ইঞ্চি বিরাট ছাতিটার মধ্যে একটা ছোট্ট প্রজাপতি তিড়িংবিড়িং লাফাচ্ছে…

…গুরুদেব স্মিত হেসে তাঁকে বলছেন, “হে রাজন্‌, তোমার এই আনন্দের দিনে আমাদের গুরুকুল তোমাকে নিয়ে সত্যিই গর্বিত। আর কেউ না জানলেও আমি জানি, ছোটবেলা থেকেই তোমার বিশ্বভ্রমণের শখ, সেই শখ পূরণে আর কোনো বাধা রইলো না, অন্তত পাঁচ বছর ধরে তুমি দুনিয়া ঘোরো যত খুশী। আশা করব চেনাজানা দেশ ছাড়া তুমি সেইসব দেশেও যাবে, যেখানে আজ অবধি এই দেশের কোনো রাজা যেতে পারেননি”…

গুরুদেবের এই আশাটাও পূর্ণ করেছেন তিনি, মাত্র এই কয়েকদিনেই প্রায় গোটা দুনিয়াটা কভার করে ফেলেছেন। যে’কটা জায়গায় এখনও যেতে পারেননি, সেগুলোও শিগগিরিই মেরে দেবেন। তাঁর ভ্রমণের ঠ্যালায় তিন-তিনটে পাসপোর্ট ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু এই ঘোরার চক্করে আসল ব্যাপারটাতেই ফাঁকি থেকে গেছে। এ যেন সেই গানটার মতন, “যতই ঘুড়ি ওড়াও রাতে, লাটাই তো আমার হাতে” – হায়! তাও যদি রাতে ঘুড়িটা অন্তত ওড়াতে পারতেন! গুরুকুলের কাজ করতে গিয়ে তো যৌবনের প্রতিটা রাত “আর কত রাত একা থাকবো” গেয়েই কেটে গেছে, কখন যে চুলদাড়ি সব পেকে গেল টেরই পেলেননা। তাও যদি নিজের মত করে দেশটাকে চালাতে পারতেন! এখন তিনি হাড়েহাড়ে বুঝছেন, আগের রাজাকে “মিউট মোহন” বলে আওয়াজ দেওয়াটা কতখানি ভুল ছিল। নির্বাক পুতুল আর কথাবলা পুতুলের মধ্যে সত্যিই কি কোনো ফারাক আছে?

ওঃ, সেদিন শরিফের বাড়ি গিয়ে মনমেজাজ পুরো শরিফ হয়ে গিয়েছিল যাকে বলে। সবসময় প্রোটোকলের যাঁতাকলে বাঁচতে পারে নাকি কোনো মানুষ? বেশ করেছেন তিনি সেখানে গেছেন, সুযোগ পেলে সামনের বছর আবার যাবেন। ঠিক স্কুল কেটে সিনেমা দেখতে যাওয়ার মতন আনন্দ পেয়েছেন তিনি কাজটা করে।

“অ্যাঁ, কি বলছো? কখন? কোথায়? কতজন? সব্বোনাশের মাথায় বাড়ি তো! ওরেবাবা রে, আমি এখন রাখছি, একটু বাদে ফোন করছি তোমাকে”।

আপন খেয়ালে হারিয়ে গিয়েছিলেন মহারাজ, রাজসিংহের আর্তনাদে চমক ভাঙল। বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে দেখলেন, রাজসিংহ ফোন নামিয়ে রেখে ধপ্‌ করে বসে পড়েছেন।

“কি হল হে তোমার?” শুধোলেন রাজামশাই।

রাজসিংহ মাথায় হাত আর মুখে হাসি নিয়ে বলে উঠলেন, “আপনার শরিফ দোস্ত রিটার্ণ গিফ্‌ট পাঠিয়েছে মহারাজ”।

“গিফ্‌ট? মানে পুরষ্কার? কি পাঠালো আমার মিত্র?”

“আজ্ঞে, জেম্‌ পাঠিয়েছে”।

“জেম্‌? মানে ইংলিশ জেম্‌? মানে বাংলায় যাকে বলে রত্ন?”

“রত্নই, তবে বানানটা একটু আলাদা”।

“মানে?”

“G-এর জায়গায় J, আর শেষের এম্‌-টা বড়হাতের। এই রত্নরা সেনাছাউনিতে হামলা করেছে মহারাজ, তিনজন সেনা মারা গেছে”।

মহারাজ বসে ছিলেন, রাজসিংহের কথা শুনে সেখানেই শুয়ে পড়লেন, আর মনে মনে বললেন, “শালা, এই ছিল তোর মনে? হাত পেতে শাল নিলি, আর আমার পেছনে শালকাঠ গুঁজে দিলি?”

মনের দুঃখে চোখ বুঁজে নাক ডাকাতে আরম্ভ করলেন তিনি।

প্রাক্‌-মনুষ্য, মনুষ্য ও মনুষ্যেতর

“এঃ শালা, ইভোলিউশনে একধাপ আগে এগিয়ে গিয়ে হেব্বি রোয়াব দেখাচ্ছিস, না? তোরা সবকটা শালা একরকম! আমরা কি কখনও উঁকি দিয়ে দেখতে যাই, যে তোরা কি করছিস? তাহলে আমাদের বিষয়ে তোদের এত কৌতূহল কেন? এতই যদি কৌতূহল, তাহলে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়া! দাঁত কেলিয়ে দেখেই আবার সরে পড়লি যে বড়? দাঁড়া, তোর হচ্ছে! যাচ্ছি আমি তোর সামনে, এবারে দেখি তোর কত দম!”

***

“কেলো করেছে রে! বেশ তো দূরে দূরে ছিলি, আবার আমার সামনে এসে বসলি কেন? ওরেবাবা রে, আবার দাঁত খিঁচাচ্ছে! কেন যে শালা মরতে উঁকি দিয়েছিলাম! পাশের রুমের জাম্বুবানটাই যত্ত নষ্টের গোড়া! আধদামড়া মিনশে, ভাল্লুকের মতন লোম নিয়ে পাবলিক প্লেসে খালি গায়ে বসে থাকতে লজ্জা করে না? ওর গলা শুনেই তো…কি করি এখন? কোনদিকে যাব? এগোনোর তো কোনো প্রশ্নই নেই, পিছিয়ে যে যাব, সে পথও যে নিজের হাতেই বন্ধ করে দিয়েছি। হে ভগবান…”

***

“দু পেয়ে জাতটাই ঢ্যামনা আর স্বার্থপর! একটু আগেই ক্যামেরার ফ্রেমে চলে গিয়েছিলাম বলে ঢিল তুললো মারবে বলে? ওই তো বদন, তার আবার ছবি, ছোঃ! ঠিক হয়েছে শালার! ওঃ, মুখখানা যা হয়েছে না, বলবার নয়। এই ফটোটাই তোলা উচিত ছিল। মরুকগে, আমি মটকা মেরে পড়ে থাকি। কিন্তু…ওফ্‌, কে যে শালা এই ‘প্রভুভক্ত’ ট্যাগটা নামের সঙ্গে লটকেছিল, ঠ্যালা সামলাতে যে হেদিয়ে গেলাম! প্রভুর হুকুম, এই বিটকেল দু-পেয়েগুলোর ‘মেন্টাল পিস’ যেন নষ্ট না হয় – প্রভুর অমান্য হই কি করে? নাঃ, উঠি, মাকালটার একটা হিল্লে করি গিয়ে। চল রে ভুলো।”

অতঃপর, সারমেয়দ্বয় গর্জন করিয়া শাখামৃগের দিকে ধাবিত হইল। সেই গর্জনে ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া শাখামৃগটি ভূমি ছাড়িয়া লম্ফ দিয়া অলিন্দ-সংলগ্ন একটি স্তম্ভ ধরিয়া ঝুলিয়া পড়িল। সারমেয়দ্বয় তাহাতে দমিল না, ক্রমাগত গর্জন করিতে লাগিল। অবস্থান নিরাপদ বুঝিয়া শাখামৃগটি তাহাদিগের উদ্দেশে ঝুলিতে ঝুলিতে মুখব্যাদান করিয়া ভেংচি কাটিতে লাগিল।

ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়া মনুষ্যটির মুখের হাসি ফিরিয়া আসিল। ক্ষিপ্রপদে দুয়ারের আড়ালে সরিয়া গিয়া এই অপটু মানুষটি তার পটু চলভাষযন্ত্রটি বাহির করিয়া এই ত্রয়ীর একখানি চিত্র হস্তগত করিয়া নিল, এবং নিজের কীর্তিতে যারপরনাই খুশী হইয়া দন্তবিকাশ করিয়া দুয়ার বন্ধ করিল।

arbit_1