প্রণাম তোমায়…

দু’মাসের বেশী হয়ে গেল, ব্লগে একটাও পোষ্ট নেই!

পোষ্ট তো অনেক বড় ব্যাপার হয়ে গেল, নিদেনপক্ষে একটা একশ চল্লিশ চরিত্রের ট্যুইট হলেও বর্তে যায় বেচারা, কিন্তু সেটাও নেই। অবস্থাটা অনেকটা খরা-কবলিত লাতুর কিংবা মারাঠওয়াড়া অঞ্চল, যেখানে একফোঁটা বৃষ্টির আশায় মিলিসেকেন্ড গুনছে সেখানকার মানুষ। কদিন আগে অবশ্য জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর থেকে আশ্বাসবাণী শোনা গিয়েছে – এবারে নাকি একশ ছয় শতাংশ বৃষ্টিপাত হবে। প্রকৃতিও আজকাল পোলারাইজড হয়ে গেছে – হয় অতিবৃষ্টি, আর নইলে অনাবৃষ্টি, আর এই দুটোতেই যেটা কমন ব্যাপার, সেটা হল অনাসৃষ্টি।

কি আর করা! প্রকৃতির পক্ষপাত থেকে চোখটা সরিয়ে ব্লগটার দিকে দৃষ্টিপাত করলাম। হুব্বা হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভাবলাম, এই দুই মাসে লিখিনি কেন? ব্যস্ততার দোহাই যে দেবো, তাতে নিজেরই লজ্জা করল। এমন কিছু রাজকার্য আমি করিনি এই দুইমাসে যে লেখার টাইম পাবনা। খানকতক গল্পের বই, ফাঁকিবাজি মেরে অফিস আর অপরিসীম ল্যাদ খাওয়া ছাড়া আর কিছুই করে উঠতে পারিনি এই সময়টায়। তাহলে?

আরো মিনিট আড়াই ভাবার পরে যেটা বুঝতে পারলাম, সেটা হচ্ছে এই যে, আমার অবস্থা হয়েছে সত্যজিৎ রায়ের নয়নের মতন। হঠাৎ একদিন নানাবিধ ভুলভাল চিন্তাভাবনা আমার মাথার মধ্যে উদয় হয়েছিল, তারপর ঠিক যেমন গরমকালের ঘামাচি বর্ষার আগমনে নিজেনিজেই মিলিয়ে যায়, সেরকমভাবেই এইসব উদ্ভট চিন্তাভাবনাগুলো মগজ থেকে মিলিয়ে গেছে। হ্যারি পটার পৌনে দশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ঢুকে পড়ার পরে দেওয়ালটা যেরকম নিরেট হয়ে গিয়েছিল, আমার মাথাটাও সেরকম খাজা কাঁঠালের মতন নিরেটাকার ধারণ করেছে।

নিজের সম্পর্কে আমার মূল্যায়নগুলো প্রায়শই ঠিক হয়। তাই এক্ষেত্রেও ‘বুলস্‌ আই’ হিট করে বেশ একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করলাম। কিন্তু বাধ সাধলো খবরের কাগজে বের হওয়া একটা খবর, যাতে বলা আছে যে মহারাষ্ট্র সরকার নাকি খরাকবলিত এলাকায় নকল বৃষ্টি নামানোর পরিকল্পনা করছেন, যার জন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বৈঠক ইত্যাদি ইত্যাদি।

খবরটা পড়ে আমার মাথার মধ্যেও পোকা নড়ে উঠলো। নকল বৃষ্টি মানে গোদা বাংলায় যাকে বলে জোর-জবরদস্তি বৃষ্টি নামানো। সেই একই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমিও জোর-জবরদস্তি ব্লগে একটা লেখা নামাবো, সে সাপ-ব্যাং-সারদা-নারদা-কেষ্ট-বিষ্টু যা-ই হোক্‌ না কেন, আর সেটা আজই।

ব্যস, প্রণাম ঠুকে নেমে পড়লাম সেই কাজে।

যতটা খিল্লি বা তাচ্ছিল্য নিয়ে ‘প্রণাম’ কথাটা বললাম, জিনিসটা কিন্তু মোটেই ততটা হেলাফেলার নয়। বঙ্গজীবনে ভাতডালমাছ কিংবা বিশেষ্য-সর্বনামের মতন প্রণামেরও একটা বড় ভূমিকা আছে। সারা জীবনে কতজনকে যে আমাদের প্রণাম করতে হয়, তার হিসেব নেই, গুনতে বসলে শেষ করা যাবেনা।

এমনিতে প্রণাম করা নিয়ে আমার অসুবিধে নেই। যাঁদের মন থেকে ভালবাসি, শ্রদ্ধাভক্তি করি, সম্মান করি, তাঁদের প্রণাম করতে আমার বরং ভালই লাগে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা প্রণামটা নেননা, বরং বুকে জড়িয়ে ধরে একটা ‘জাদু কি ঝাপ্পি’ দেন, তাতে মনটা একদম ফুরফুরে হয়ে যায়।

কিন্তু গোল বাধে যখন ইচ্ছের বিরুদ্ধে, অচেনা কোনো মানুষকে, ব্যক্তিটি শুধুমাত্র বয়োঃজ্যেষ্ঠ বলে, তাঁকে প্রণাম ঠুকতে হয়। আমার নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি, ছোটবেলা থেকে এমন অনেককে আমি প্রণাম করেছি যাদের আমি সেই একবারই দেখেছি। ব্যাপারটা আরো বেশী করে ঘটে কোনো অনুষ্ঠানবাড়িতে কিংবা গেট টুগেদার-এ।

দৃশ্যটা খুবই চেনা। মা-মাসী-পিসিদের মধ্যে কেউ এসে বলবেন, “শুনছিস, ইনি হলেন…” বলে নানাবিধ সম্পর্কের গলিঘুঁজি পেরিয়ে যেখানে থামবেন, সেখানে আমি পৌঁছতে তো পারবই না, উল্টে আমার মনের মধ্যে জেগে উঠবে সেই অনিবার্য প্রশ্ন – তাহলে ইনি আমার কিনি হলেন? প্রশ্নটা নিয়ে যে একটু ভাবব, তার ফুরসত পাওয়া যাবেনা, কেননা তারপর আমাকে হয় বলা হবে, “এঁকে প্রণাম কর”, নয়তো চোখ দিয়ে ইশারা করা হবে কাজটা করার জন্য।

প্রথমটা হলে ব্যাপারটা অল্পে চুকে যাবে। আমি টপ করে একটা প্রণাম ঠুকে দেব, প্রাপক তাঁর ঝুলি থেকে একটা হাসি দিয়ে বলবেন, “ও মা! কত্ত বড় হয়ে গেছিস! আমাকে মনে আছে? আমি তোকে সেই তোর মুখেভাতের সময় দেখেছিলাম!” জবাবে আমি খানিক ‘হেঁ হেঁ’ করে কেটে পড়ব, বলা হবেনা যে মুখেভাতের সময় দেখলে আমার তাঁকে মনে থাকার কথা নয়।

কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাপারটা আমার পক্ষে খুব চাপ হয়ে যায়, কেননা চোখের ইশারাটিশারা আমি একেবারেই বুঝিনা। ফলে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় খুবই অস্বস্তিকর। একদিকে যিনি পরিচয় করাচ্ছেন, পর্যায়ক্রমে চোখ ঘুরিয়ে আর ভুরু নাচিয়ে তাঁর চোখ আর ভুরু দুটোতেই ব্যথা হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সেটার বিন্দুবিসর্গ বুঝতে না পেরে আমিও ভুরু তুলে নিঃশব্দে কারণ জানতে চাইছি বা হাঁ করে ইশারাটা বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা করছি। কিন্তু সবচেয়ে বিপদে পড়েন তৃতীয়পক্ষ। হাসিহাসি মুখে একটা প্রণাম নেওয়ার জন্য তিনি মানসিকভাবে তৈরী, পাদুটো খানিক এগিয়েও এনেছেন, এমনকি আশীর্বাদে কি বলবেন সেটাও মনেমনে ছকে ফেলেছেন, কিন্তু আমার মতন গবেটের জন্যেই তিনি তাঁর প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ছোটবেলায় এর জন্য মায়ের কাছে পরে যে কত কানমলা খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই।

বিয়েবাড়ি হলে ব্যাপারটা আরো খোলতাই হয়, যার পুরোভাগে থাকে নববিবাহিত বর-বউ, আর প্রাপকের দলে থাকেন উভয়ের নিকটাত্মীয় এবং, ওই যাকে বলে, এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি। বাঙালিদের ‘এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি’ আক্ষরিক অর্থেই বৃহৎ এবং ব্যাপক। পাড়ার গেজেটেড পিসিমা থেকে পাশের বাড়ির কুচুটে মেজবৌ, পাড়াতুতো পিসেমশাই থেকে ফ্যামিলি ফ্রেন্ড খাসনবিশ কাকু-কাকিমা – সক্কলে এই ট্যাগে বেশ ভালভাবে এসে যান। বিয়ের পরে বরবাবাজি বউ নিয়ে বাড়ি ফিরলে তারপর থেকেই শুরু হয় এঁদের আনাগোনা। “অ্যাই ভুতো, তোর বউ দেখতে এলাম” বলে তাঁরা নববধূকে ঘিরে ধরেন, আর সদ্য নতুন পরিবেশে আসা মেয়েটি মুখে প্লাস্টিক হাসি লাগিয়ে প্রণাম করে চলে তাঁদের। বঙ্গ সংসারে নতুন বউ এই পাইকারি রেটে প্রণাম করে কতটা সুনাম কুড়োয় জানিনা, তবে সেটা না করলে যে অশেষ দুর্নামের ভাগীদার হয়, সেটা বলাই বাহুল্য।

এই প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুর করুণ অভিজ্ঞতার কথা একটু বলা যাক। অনেক পুরনোদিনের বন্ধু, তাই ওর বিয়েতে প্রচুর হল্লাহাটি করে বউভাতের পরেরদিনই ফের হানা দিয়েছিলাম, ফুলশয্যা কেমন হল জানার জন্য। গিয়ে দেখি বন্ধু ছাদের এককোণে বসে চুপচাপ সিগারেট টানছে, দৃষ্টি উদাস। জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে ব্যাটা, কাল রাতে বেড়াল মারলি?”

একটা বিরাট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধু বলল, “কই আর মারতে পারলাম! গত তিনদিন ধরে প্রায় দুশো লোককে পেন্নাম ঠুকে ঠুকে আমার বৌয়ের মাসাক্কালি কোমরে খিঁচ ধরে গেছে। কাল সব মিটে যাওয়ার পরে ঘরে এসে সেই যে কোমরে আইসপ্যাক ঠেসে ধরেছে, এখনও নামায়নি। শালা, ভাল লাগে বল? কালকের রাতটা কি আর ফিরে আসবে?”

বন্ধুর জন্য সত্যিই খুব কষ্ট হল। ওর বউয়ের জন্যেও! বেচারী এখন প্রণামের প্রণামী সামলাতেই ব্যস্ত।

শেষ করার আগে একটা ঘটনার কথা বলি। এটা অনেক পুরনো, প্রায় বছর পঁচিশ আগের। সচরাচর এতদিন আগেকার ঘটনাবলী আমার মনে থাকেনা, কিন্তু কেন জানিনা এই ঘটনাটা এখনও আমার মনে থেকে গেছে। পরিবারের সকলে মিলে যাওয়া হয়েছিল আমার বড়কাকুর বাড়িতে। বারাকপুর স্টেশন থেকে বাসে করে দেবপুকুর, তারপর সেখান থেকে রিকশা বা পায়ে হেঁটে গনেশপুর গ্রামে কাকুর বাড়ি। এখন যদিও জায়গাটা প্রায় শহর হয়ে গেছে, আর এত কসরত করে যেতেও হয়না, স্টেশন থেকেই অটো পাওয়া যায়, কিন্তু বছর পঁচিশেক আগে জায়গাটা বেশ প্রত্যন্ত গ্রামই ছিল। কারেন্ট থাকার তো প্রশ্নই নেই, বরং কাকুর বাড়ির পাশেই ছিল একটা বাঁশবাগান, আর সন্ধ্যা হলেই সেখান থেকে শেয়ালের ডাক শোনা যেত। কুপি আর হ্যারিকেনের আলোয় বেশ একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ তৈরি হত, আর বড়জেঠুর কাছে সবাই মিলে ভূতের গল্প – বেশ জমে যেত পুরো ব্যাপারটা।

বড়কাকুর বাড়ি থেকে একটু দূরেই ছিল কানুকাকুর বাড়ি। মূলত বড়কাকুর বন্ধু হলেও, সদাহাস্যময় এই মানুষটির সঙ্গে আমাদের সবারই জানাশোনা ছিল। আমাকে এবং আমার খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাই-বোনেদেরও তিনি খুব ভালবাসতেন, দেখা হলেই পালা করে আমাদের সবাইকে সাইকেলে চড়াতেন।

সেবার কি একটা উপলক্ষ্যে কানুকাকুর বাড়িতে আমাদের সবার নিমন্ত্রণ ছিল। বেশ জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হল। কানুকাকুর মা আমাদের জন্য প্রচুর রান্নাবান্না করেছিলেন। যত্নসহকারে আমাদের সবাইকে খাওয়ালেন – খাবারের স্বাদ ছিল অসাধারণ – এমনকি গরমে আমাদের যাতে কষ্ট না হয়, সেজন্য ঠায় বসে থেকে আমাদের তালপাখা দিয়ে হাওয়াও করলেন। ভদ্রমহিলার বয়েস তখনই প্রায় সত্তরের কাছাকাছি, কিন্তু তাঁর উৎসাহে-উদ্যমে সেটা বোঝাই যেত না।

আমরা যখন বেরোব-বেরোব করছি, জনৈক মুখুজ্যেমশাই এলেন কানুকাকুর বাড়ি। বয়স্ক লোকটির হাবেভাবে বেশ একটা মুরুব্বি-মুরুব্বি ভাব ছিল, হয়তো কোনো মোড়লগোছের হবেন, চোখেমুখেও বেশ একটা ঘোড়েলভাব ছিল। কানুকাকুর মা তাঁকেও প্লেটভর্তি খাবার দিলেন – লুচি, মিষ্টি, পায়েস ইত্যাদি। মুখুজ্যেমশাই অল্প খুঁটে খেলেন, বাকিটা প্রসাদ করে রেখে দিলেন। এরপর দেখি, আমাদের বাড়ির সবাই ঢিপঢিপ করে তাঁকে প্রণাম করলেন। বাড়ির বড়রা কাউকে প্রণাম করলে ছোটদেরও করতে হয়, সেটাই নিয়ম, তাই আমরাও বাদ গেলাম না।

বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আচ্ছা মা, তোমরা সবাই মুখুজ্যেমশাইকে প্রণাম করলে কেন? ওঁকে কি চেনো?”

মা বলেছিলেন, “না, সেদিনই দেখলাম। খারাপ কি, বয়স্ক মানুষ, প্রণাম তো করাই যায়। তবে ব্যাপারটা কি জানিস, সেদিন কানুবাবুর মা আমাদের সবার যা যত্ন করেছিলেন, আমাদের সকলেরই উচিৎ ছিল তাঁকে একটা প্রণাম করা”।

“করলে না কেন?”

“কি করে করব? আর কেউ তো করেনি। আমি তাঁকে প্রণাম করলে অন্যরা হয়তো ইচ্ছা না থাকলেও কাজটা করতে বাধ্য হত। সেটা হয়তো অনেকেরই ভাল লাগতো না, কানুবাবুরা তো আর ব্রাহ্মণ নন”। তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ফের বলেছিলেন, “সংসারে যার যেটা প্রাপ্য, অনেকেই সেটা পায়না, আবার অনেকেই অযাচিতভাবে অনেককিছু পেয়ে যায়, যোগ্যতা না থাকা সত্বেও। বড় হ’, বুঝবি”।

কচি বয়েস আমার তখন, তাই সেই বৃদ্ধার জন্য খুব খারাপ লেগেছিল । মনে মনে ঠিক করেছিলাম, পরেরবার বড়কাকুর বাড়ি গেলে টুক করে গিয়ে তাঁকে একটা প্রণাম করে আসব। কিন্তু পরেরবার যখন গেলাম, শুনলাম তার কিছুদিন আগে তিনি মারা গিয়েছেন।

Advertisements

লক্ষ্মীর প্রবেশ ও প্রস্থান

শনিবারের বারবেলায় ছ’ছটা এসএমএস দেখে একদম যাকে বলে ব্যোমকে বিয়াল্লিশ হয়ে গেলাম!

অথচ দিনটা শুরু হয়েছিল খুবই স্বাভাবিক এবং ঘটনাবিহীনভাবে। সকালে উঠে, চা-জলখাবার-ল্যাদ খেয়ে, বই-কাগজ উল্টেপাল্টে দেখে, ব্যাঙ্কে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। গিন্নীর নির্দেশ ছিল সকাল সকাল ব্যাঙ্কের কাজ সেরে এগারোটার মধ্যে বাড়ি ফিরে এসে মাংস রান্না করতে হবে। আমার সময়জ্ঞানটা চিরকালই একটু গোলমেলে, তাই বেরোব বলে যখন গতর তুললাম, তখনই ঘড়িতে সোয়া এগারোটা বেজে গেছে। তাতে কি? সেই যে ‘বেটার লেট দ্যান নেভার’ বলে একটা কথা আছে না? যিনি বলেছিলেন, অজানা সেই ব্যক্তির প্রজ্ঞা আর দূরদর্শিতাকে শতকোটি প্রণাম জানিয়ে গিন্নিকে টা-টা করে রাস্তায় নেমে পড়লাম।

পাওলো কোয়েলহো বলেছেন, “খুব মন দিয়ে কিছু চাওয়া হলে নাকি সারা ব্রহ্মান্ড ষড়যন্ত্র করে চাহ্‌নেওয়ালাকে সেই চাহিতা জিনিসটি পাইয়ে দেয়”। অবশ্য পাওলোবাবু কথাটা অনেক কাব্যিক এবং সুরেলা ভাষায় বলেছেন, আমার মতন অসুরের পাল্লায় পড়ে সেটা এরকম ট্যাঁরাব্যাঁকা হয়ে গেল, সেজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে মূল বক্তব্যটা এরকমই ছিল আর কি।

যাই হোক, এই কথাটা বলার পেছনে যে কারণটা, সেটা হচ্ছে এই যে, আমি যে ব্যাঙ্কের উপভোক্তা, সম্প্রতি তার একটি শাখা অফিস খুলেছে আমার বাড়ি থেকে দশ মিনিট হাঁটাপথে, ‘হুমা সিনেমাহল্‌’-এর গায়ে। আগে ব্যাঙ্কের কাজকর্ম সারতে হলে অফিসপাড়ায় যেতে হত, যেখানে এমনিদিনেই আমার যেতে ইচ্ছে করেনা, আর উইকএন্ডে তো নাম শুনলেই গায়ে জ্বর আসে। তাই মাঝেমাঝেই ভাবতাম যদি বাড়ির কাছে একটা শাখা থাকতো! আমার সেই ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছে মাসখানেক আগে।

শাখাটা যদিও খুবই ছোট। ট্রানজাকশন সেকশানে একজন, আর ব্যাঙ্কের অন্যান্য কাজকর্ম দেখার জন্য দুইজন – মোট তিনজন কর্মচারী এখানে আছেন। নিত্যনৈমিত্তিক কাজের জন্য এটাই যথেষ্ট, বাকি কাজকর্মের জন্য নেটব্যাঙ্কিং তো আছেই।

ট্রানজাকশন সেকশানে যিনি বসেন, তাঁর নাম সন্দীপ তুপে। আগে যে বারদুই এখানে এসেছি, প্রতিবারই তিনি আমাকে বলেছেন, “আমাদের নতুন ব্রাঞ্চ, যদি বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়পরিজন কেউ থাকে, তাদের প্লিজ এখানে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য রেফার করবেন”। এছাড়া আরো কিছু মামুলি কথাবার্তা হয়েছে, যার ফলে তুপেজীর সঙ্গে আমার বেশ একটা মুখচেনার-বেশী-বন্ধুত্বের-কম ব্যাপার হয়ে গেছে।

এবারের কাজটা ছিল অতি সামান্য – একটা চেক জমা করার কাজ। সেটা করতে লাগলো পাঁচ মিনিট (যদিও আমি গত দশদিন ধরে আসছি-আসব করছিলাম), তারপর ‘হুমা’ থেকে ‘এয়ারলিফ্‌ট’-এর সাড়ে পাঁচটার শো’র দুটো টিকিট কেটে মনের আনন্দে যখন বাড়ি ঢুকলাম, তখন বারোটা বাজতে পাঁচ।

যাক্‌, মুরগীটা পৌনে একটার মধ্যে রান্না হয়ে যাবে। অফিসে না পারলেও, বাড়িতে অন্তত ডেড্‌লাইনের আগেই কাজ নামিয়ে ফেলতে পারবো। এসব ভেবে মনের আনন্দে একটা সিগারেট ধরালাম। ঠিক তখনই টুং শব্দ করে সেলফোন জানান দিল একটা মেসেজ ঢুকেছে। নিশ্চয়ই কোনো রেস্তোরাঁ কুপনটুপন দিচ্ছে, এই ভেবে মেসেজটা খুলেই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম।

মেসেজটা প্রেরক আমার ব্যাঙ্ক, যার বক্তব্য হল যে জনৈক তুষার নরেশ পাটিল আমার অ্যাকাউন্টে পঞ্চান্ন হাজার টাকা জমা করেছেন।

সিগারেটে প্রথম টানটা সবে দিয়েছিলাম, খুকখুক করে কাশি পেয়ে গেল। গিন্নী রান্নাঘর থেকে কমেন্ট পাস করল, “কতবার বলেছি সিগারেট না খেতে, তা কে শোনে কার কথা?” ওর কথায় আমল না দিয়ে কাশতে কাশতেই ধোঁয়াটা ছাড়লাম, আর ধোঁয়াটা বেরোতে যতটা সময় লাগলো, তার চেয়েও কম সময়ে আরো চারবার টুং টুং শব্দ করে চারটে মেসেজ ঢুকলো। চারটেই এসেছে ব্যাঙ্ক থেকে, আর সবারই বক্তব্য এক, শুধু তুষার নরেশ পাটিলের জায়গায় সাবিনা দুগাল, শুধা প্রসন্ন, রেমন্ড শ্রফ্‌ আর প্রতীক সাওয়ান্ত। এরা চারজনে মিলে আমার অ্যাকাউন্টে সব মিলিয়ে সাড়ে তিনলাখ টাকা জমা করেছেন।

সিগারেটের নামে অনেক লোক অনেক নিন্দেমন্দ করেন, আমার কিন্তু সিগারেটকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে তুলনীয় মনে হয়। সুখে-সুঃখে-আনন্দে-শোকে-আশায়-নিরাশায়-প্রেমে-বিরহে মানুষের সঙ্গ দিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যেরকম জুড়ি নেই, সেরকম সিগারেটও কিন্তু এই সবকটা ইমোশনে আমাদের সঙ্গ দিয়ে থাকে, নেহাৎ কুলীন নয় তাই বেচারা কল্কে পায়না।

এক্ষেত্রেও সিগারেটটা ছিল বলে মাথাটা পুরোপুরি ঘাঁটলো না। পরপর দুটো টান দিয়ে কি করব ভাবছি, এমন সময় ছয় নম্বর মেসেজটা এল, যেখানে দেখলাম ‘ভীরা ট্র্যাভেলস্‌ অ্যান্ড লজিস্টিক্‌স’ আমার অ্যাকাউন্টে দেড়লাখ টাকা জমা করেছে।

যা বুঝলাম, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি সাড়েপাঁচলাখ টাকার মালিক হয়ে গিয়েছি!

প্রথম রিঅ্যাকশন হিসেবে, মনে হেব্বি পুলক জাগলো। আইব্বাপ, সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা! এ দিয়ে তো একটা অটোমেটিক মারুতি সেলেরিও গাড়ি হয়ে যাবে! কানের কাছে নোটের খসখস শব্দ আর কয়েনের ঝনঝনানি শুনতে পেলাম। সোফায় গুছিয়ে বসে সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে মানসচক্ষে এও দেখলাম, ‘কিঁউ চল্‌তি হ্যাঁয় পবন’ শুনতে শুনতে আমি নীল সেলেরিও চালিয়ে মুম্বই-পুণের মাখন হাইওয়ে দিয়ে সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছি।

বিভোর হয়ে সেলেরিও চালাচ্ছিলাম, এমন সময়ে ঠোঁটে ফিল্টারের ছ্যাঁকা খেয়ে এবড়োখেবড়ো লালবাহাদুর শাস্ত্রী মার্গে আছড়ে পড়লাম। মানসচক্ষু উবে গিয়ে জ্ঞানচক্ষু ফুটলো। আজ যেরকম অজানা-অচেনা পাঁচজন আমার অ্যাকাউন্টে বেমক্কা সাড়ে পাঁচলাখ দান করে দিল, সেরকম কাল যদি কোনো হরিদাস পাল গোটা অ্যাকাউন্টটা ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়, তখন কি হবে? তখন তো একুল-ওকুল দুই-ই যাবে, তার সঙ্গে আমাকেও বিলকুল নাঙ্গা ফকির হয়ে অনুকুল ঠাকুরের আশ্রমে চলে যেতে হবে। ব্যাপারটা ভেবেই আমার সর্বাঙ্গে কুলকুল করে ঘাম ফুটে উঠলো।

গিন্নীর সঙ্গে আলোচনা করে দুজনেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে সবার আগে ব্যাঙ্কেই যাওয়া উচিৎ, কেননা গোটা ব্যাপারটা সেখান থেকেই শুরু হয়েছে কিনা!

আবার রাস্তায় নামলাম। চলতে চলতে ভাবলাম, ব্যাঙ্ক যদি এর সমাধান করতে না পারে, যদি পুলিসের কাছে পাঠিয়ে দেয়, তাহলে তো কেলোর কীর্তি হয়ে যাবে। মরাঠি পুলিশ যদি দাঁত কিড়মিড় করে ইকড়ে-তিকড়ে-কুঠে-সাঠি এইসব বলে লাঠি বাগিয়ে তেড়ে এসে আমাকেই জেলে পুরে দেয়, তাহলে তো চিত্তির। নিরপরাধীদের ওপরেই পুলিশের বেশী রাগ কিনা!

যাই হোক, আবার গিয়ে দাঁড়ালাম তুপেজীর সামনে। ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলাম বিষয়টা। গোটা বিষয়টা শোনার পরে তুপেজী এক হাতে তাঁর ফোনের বোতাম আর অন্যহাতে কী-বোর্ড টিপতে লাগলেন। আমি চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার পেছনে যাঁরা লাইন দিয়েছিলেন, তুপেজী তাঁদের সবাইকে দশ মিনিট পরে আসতে বললেন। লোকগুলো আমার দিকে আগুনে দৃষ্টি দিয়ে এদিকসেদিক ছড়িয়ে গেলেন। ওঁদের দোষ নেই, ওঁদের জায়গায় থাকলে আমিও ওরকম দৃষ্টিই দিতাম।

বেশ অনেকক্ষণ বাদে – আমার হিসেবে আধঘন্টা আর ঘড়ির হিসেবে সাড়ে সাত মিনিট – তুপেজী মুখ তুলে বললেন, “চিন্তার কিছু নেই, দশমিনিটের মধ্যেই আপনার অ্যাকাউন্ট ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আপনি একটু বসুন, আমি ডেকে নেব”।

কি আর করি! বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট টেনে এলাম। সিগারেটের এই আর একটা খুব ভাল গুণ – ছোটবড় ওয়েটিং টাইমগুলো খুব সহজেই কেটে যায়, ওয়েট যে করছি, সেটা বোঝাই যায়না।

ভেতরে এসে বসে সবে হোয়াটস্‌অ্যাপটা অন্‌ করেছি, এমন সময় তুপেজী ডাক দিলেন। এক ঘন্টার মধ্যে তৃতীয়বার গিয়ে দাঁড়ালাম তাঁর সামনে।

আমাকে দেখেই তুপেজী বলে উঠলেন, “স্যার, আপনার অ্যাকাউন্ট ক্লিয়ার হয়ে গেছে। বাড়তি পেমেন্টগুলো সব রিভার্ট করে দিয়েছি। এখন যা আছে, সেগুলো সব আপনারই”।

মনে মনে বললাম, “আমি কেতাত্থ হয়েছি আর কি”। তারপর শুধোলাম, “কিন্তু হয়েছিলটা কি?”

তুপেজী মধুর হেসে বললেন, “ইয়ে মানে, আপনার ঠিক পরেই এক ম্যাডাম এসে পরপর কিছু পেমেন্ট করলেন নিজের অ্যাকাউন্টে… ওনার সব ক্লায়েন্টদের পেমেন্ট আর কি… তো হয়েছিল কি, সেই পয়সাগুলো সব আপনার অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে গিয়েছিল, মানে অ্যাকাউন্ট উইন্ডোটা বদলাতে ভুলে গিয়েছিলাম”।

যাঃ শালা! এ মাল বলে কি? এ তো তুপে নয়, পুরো তোপ মাইরি! কথা শুনে হাসব, না কাঁদব, বুঝে উঠতে পারলাম না। হুব্বা হয়ে তুপের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, এমন সময় তিনি আবার বললেন, “তবে আপনাকে থ্যাঙ্কস দাদা, ভুলটা তো আমারই। আপনি ছুটে না এলে আমাকে প্রচুর ছোটাছুটি করে ব্যাপারটাকে সামাল দিতে হত। ভেরি মেনি থ্যাঙ্কস”।

কি আর বলব? কাষ্ঠহাসি দিয়ে সরে পড়লাম তুপেজীর সামনে থেকে।

বাড়ি এসে নেটব্যাঙ্কিং-এর মাধ্যমে তুপেজীর কথার সত্যতা যাচাই করে নিলাম। আমার অ্যাকাউন্ট আবার তার পূর্বাবস্থা ফিরে পেয়েছে। যেভাবে ছয়জনের টাকা জমা পড়েছিল, ঠিক সেই অর্ডারে সেগুলো রিভার্টেড হয়ে গেছে।

গিন্নীকে গোটা গল্পটা বললাম। সব শুনে ও বলল, “আচ্ছা ধর, তুমি যদি ফিরে না যেতে, তাহলে টাকাগুলোর কি হত?”

এই একই প্রশ্ন আমার মাথাতেও ঘুরছিল। সত্যিই কি আমরা অতগুলো টাকা হজম করে নিতে পারতাম? মনে হয় না। আজ না হলেও, দুদিন বাদ ঠিকই ব্যাপারটা ধরা পড়ে যেত। তুপেজী তো কেস খেতেনই, সঙ্গে সঙ্গে আমিও ফেঁসে যেতাম।

গিন্নী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “জোর বেঁচে গেলে। আমিই মুরগীটা বানিয়ে নিলাম আজ। তবে সামনের দিন কিন্তু…”

আমি হড়বড়িয়ে বলে উঠলাম, “সে আর বলতে? আসলে মা লক্ষ্মী এলেন, আবার চলে গেলেন…এইসবে অনেক ধকল গেল তো, তাই বলছিলাম, এককাপ চা খাওয়াবে?”

“হুঁ”, বলে গিন্নি রান্নাঘরে চলে গেল।

আটআনা সুখ আর আটআনা স্বস্তি মিশিয়ে আমি একটা শ্বাস ছাড়লাম।